ধান ভানতে নেমে আগে শিবের গীতটা বলা যাক।
লারা ফাবিয়ান বেলজিয়ামের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী। ২০০১ সালে প্যারিসে একটি কনসার্টে ভক্তরা তাঁকে ভীষণ চমকে দেন। ‘জ’তেম’(আমি তোমাকে ভালোবাসি) তাঁর বিখ্যাত একটি গান। ফাবিয়ান মঞ্চে উঠে একটি জায়গায় বসে গানটি শুরুর আগেই উপস্থিত ভক্তরা গাইতে শুরু করেন। শুধু কি তা–ই, ভক্তরা গাইতে গাইতে ‘জ’তেম’-শব্দ উচ্চারণও একটু পাল্টে ফেলেন। গানে ওই শব্দের জায়গায় তাঁরা ‘অন তে’ ইম’(আমরা তোমাকে ভালোবাসি) কোরাস গেয়ে ওঠেন।
ফাবিয়ান যারপরনাই অবাক। ভীষণ আবেগময় সেই মুহূর্তে কিংবদন্তির চোখে জল। কাঁদছিলেন মঞ্চেই। সেই কনসার্টের আগে ফাবিয়ানের ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ভীষণ মানসিক চাপে ছিলেন। ভক্তরা সেটা জানতে পেরে গানটি ওভাবে গাওয়ার পরিকল্পনা করে রাখেন আগেই।
যে শিল্পীর গানে ভক্তরা নিজেদের বাজে সময়গুলো কাটিয়ে উঠেছেন, সেই শিল্পী নিজে যখন অমন পরিস্থিতিতে পড়েন, তখন আসলে ভক্তদের হৃদয়ের ‘দেনা’ শোধ করতে হয়। প্রায় হাজার দশেক গলার সুরে সুরে ‘অন তে’ ইম’—কথাটি ছিল তেমনই এক নৈবেদ্য।
এবার ধান ভানায় ফিরতে হয়।
.গানের মতো ফুটবলও পারফর্মিং আর্ট। ভেতরের পরিস্থিতি যেমনই হোক, বাইরে, মানে মাঠে নেমে পারফর্ম করতেই হয়। তবু মাঝেমধ্যে সেই পারফর্মের মধ্যেও কারও কারও ভেতরে বান ডাকে। চোখের বাঁধ সেটা ঠেকাতে পারে না। কানসাস সিটিতে ঠিক যেমনটা দেখা গেল লিওনেল মেসিকে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ। মেসি প্রথম গোলের পর চোখের জল আটকাতে পারেননি। বাড়িতে অসুস্থ বাবাকে রেখে এসেছেন বিশ্বকাপে খেলতে। দুশ্চিন্তার সেই পাথর বুকে চেপেই সমর্থকদের চোখে মায়াঞ্জন মেখে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু মেসির ভেজা চোখ দেখে আর্জেন্টিনার ভক্তরা আর চুপ করে থাকতে পারেননি। গ্যালারিতে গান ধরেন অনেকেই। জীবনভর যাঁর খেলার মোহে ডুবে কত রকম বাজে সময় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া গেছে, তাঁর জন্য অন্তত অতটুকু তো করাই যায়!
কিংবা না করলেই–বা কী হতো?
.সেই যে সেই সময়টা, যখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে ‘মেসি একা কী করবেন’ হাসিঠাট্টায় মুখর বিশ্ব, তখনো তো তাঁর জীবনে খারাপ সময় এসেছে। লোকে বলেছে, সে শুধুই বার্সেলোনার, আর্জেন্টিনার নয়। এমন কথায় কান পচতে পচতে আর মাঠে আকাশি-সাদায় ব্যর্থ হতে হতে মেসি তো অবসরও নিয়েছিলেন। দরদ তো অনেকেরই ছিল, কিন্তু তির্যক রসিকতা কি তখনো থেমেছিল?
না। থামেনি। থামেননি মেসিও।
আবারও মাঠে ফিরে ধীরে ধীরে সেই যে নিজেকে আরও উজার করে নিংড়ে দিতে শুরু করলেন, সেটা থামেনি আজও। আর এভাবে মেসিও আসলে এখন আর শুধুই ফুটবলের সীমানায় নেই। মেসির পায়ে বল দেখলে আগে অনেকেই যেমন দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতেন, এখনো ঠিক তা–ই। ভেজা চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পেপ গার্দিওলা সম্ভবত এ জন্যই বলেছিলেন, ‘তাকে নিয়ে লিখো না, বর্ণনার চেষ্টাও কোরো না। শুধু দেখে যাও।’
.তিন ‘কবিতা’য় শুরু মেসির শেষের ‘কবিতা’.গার্দিওলা আসলে বোঝাতে চেয়েছিলেন, যা ব্যাখ্যাতীত, তা বর্ণনার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে দেখে যাওয়াই ভালো। কেন, সেই ব্যাখ্যায় একটি প্রশ্ন—আচ্ছা, লিওনেল মেসির সেরা সময় তো অনেকের জীবনেরই শ্রেষ্ঠ সময়?
উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তবে পরের প্রজন্মকে তাঁর গল্পটা বলে যাওয়ার ভার আপনার কাঁধে। আজ থেকে অনেক দিন পর সেই ভারমুক্ত হওয়ার লগ্নে এই ক্ষণটাও হয়তো মনে পড়বে। মেসি নামের ‘সূর্যোদয়’ দেখার পর বেলা দ্বিপ্রহর গড়িয়ে এখন সেই ‘সূর্য’ গোধূলির অস্তাচলে। আর ‘অস্তাচলে সূর্য ডুবে গেলে ফিরিয়ে কি তাকে আনা যায়!’
যায় না। সে জন্যই এবারের বিশ্বকাপটা একটু অন্য রকম। শীত আসি আসি করার আগে উত্তুরে হাওয়ায় শরীরটা যেমন একটু কনকন করে, তেমন। সবাই জানে, মেসিকে ছাড়া আগামী বিশ্বকাপে সেই মন কেমনের ‘শীত’টা আরও জেঁকে বসবে!
তখন তো আর শত রকম মানসিক যাতনায় একরকম ‘মহৌষধ’দেওয়ার লোক থাকবে না আকাশি-সাদা মেঘের ভেলায়। বল পায়ে মেসির মাঠে চরে বেড়ানো যদি হয় সেই মহৌষধ, তাহলে তো রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটির কাছে ঋণ থেকেই যায় মানুষের।
সেই ঋণই–বা কেমন? আচ্ছা, জীবনে চলার পথে কোথাও ঠেকে গিয়ে কখনো কখনো মেসির ড্রিবলিংকে মনে পড়েনি? সূচিভেদ্য জটলার মধ্যেও বল পায়ে যেন তিনি রোজারিওর বহতা নদীর স্রোত। কোনোভাবেই আটকানো যায় না। মেসি তখন কিন্তু শুধুই আর ফুটবলার থাকেন না। হয়ে ওঠেন কিংবা এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা দল ছাপিয়ে হয়ে গেছেন পৃথিবীর সব মানুষের আনন্দ ও প্রেরণার ফেরিওলা।
.অথচ গ্রোথ হরমোন সমস্যায় ছোটবেলায় তাঁর ভালোমতো বেড়ে ওঠারই কথা ছিল না। সেই মানুষটাই এখন বাড়তে বাড়তে এত বড় যে ‘জ্যাক অ্যান্ড বিনস্টক’ নামে ইংরেজি রূপকথা মনে পড়ে।
আচ্ছা, মেসি কি গল্পের সেই শিমগাছ? বাড়তে বাড়তে যে গাছ একদিন আকাশ ফুঁড়ে পৌঁছে গিয়েছিল অন্য জগতে। সেই গাছ বেয়ে একটি ছোট্ট ছেলেও তো পৌঁছে গিয়েছিল সেখানে। তারপর সেই যে ‘দৈত্য’ আকাশ থেকে নেমে এল পৃথিবীতে, গাছও কাটা পড়ল—মেসিকে গল্পের সেই শিমগাছ ধরলে দৈত্য তো আসলে সময়। আর সেই ছোট্ট ছেলেটি পৃথিবীব্যাপী তাঁর ভক্তকুল, যাঁরা এখন প্রতিটি সূর্যাস্তের সঙ্গে টের পাচ্ছেন, সময় কাউকেই চিরকাল ধরে রাখতে দেয় না। বুট তুলে তাই জায়গা করে নিতে হয় ইতিহাসের পাতায়।
সে ইতিহাসের গল্পে হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালা নামে একজন আছেন। মেসি কি সেই বাঁশিওয়ালার মতো? বল পায়ে যাঁর সুরেলা ছন্দের বলে বিশ্বকাপ দেখতে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ সাইকেলে চেপে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে পারেন তাঁর ভক্তরা। শুধু তাঁরা কেন, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচে রাস্তাঘাট যে ফাঁকা হয়ে পড়ে, সেটা তো সেই ডাকাতিয়া ‘বাঁশি’র টানেই!
.সেই টানেই মেসির খেলা দেখতে গ্যালারিতে ছুটে যান শতবর্ষী ভক্ত। সকালের অফিসকে কাঁচকলা দেখিয়ে গভীর রাতে টিভির সামনে বসে যান বাড়ির কর্তা, লুকিয়ে কাঁথা-চাদরের ভেতর থেকে টিভি কিংবা ফোনে চোখ রাখে সেই বাড়িরই ছোটরা। মেসি তখন আর শুধু ফুটবলার থাকেন না। কারণ, তাঁর ভালো-মন্দ খেলার ছাপ যে পরদিন যাঁর যাঁর রোজকার কাজেও পড়বে, সেটা তো প্রায় সবাই নিজ নিজ জীবন থেকেই জেনেছেন।
এত দিন সে জীবনে মেসির জন্মদিন বয়ে এনেছে আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু এবারের সুরটা একটু ভিন্ন। বিশ্বকাপের মাঝে আজ ৩৯ বছরে পা রাখলেন মেসি—এই কথাটি বলতে গিয়ে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির বিষয় হলো, গোধূলিতে সূর্যের অস্ত যাওয়াটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আঁধার নামবে আরেকটু পরই।
মেসি, আপনার এবারের জন্মদিনটা তাই মোটেও আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং তা অনেকের জন্যই মনে মনে অবলম্বন হারানোর চোখরাঙানি। তবু তো বলতেই হবে, শুভ জন্মদিন, ‘অন তে’ ইম’(আমরা তোমাকে ভালোবাসি)। এই বলায় যে দলা দলা কষ্টে গলাটা ধরে আসে, মেসি তার কতটুকু জানেন!
.পৃথিবীটা এখনো মেসির





