সুন্দরবন থেকে চলতি বছর মধু আহরণ গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বন বিভাগের হিসাব বলছে, ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলা মধু আহরণ মৌসুমে সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু। এক বছরের ব্যবধানে পরিমাণ কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল।

বননির্ভর মানুষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বনদস্যুদের আতঙ্কে অনেক মৌয়াল এবার বনে যেতে সাহস পাননি। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত ও ফুলের ঘাটতি উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধুর পাশাপাশি ৫২১ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহ করা হয়েছে। এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা। গত বছর একই সময়ে মধু সংগ্রহ হয়েছিল ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল।

.

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, সুন্দরবনে মধু আহরণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালে সংগ্রহ হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে। ২০২৩ সালে সংগ্রহ হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল। এরপর ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। চলতি বছর সেই পরিমাণ আরও কমে হয়েছে ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে মধু আহরণ কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

সুন্দরবনের প্রধান মধু আহরণ এলাকা পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ৮৭৭ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ হয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জে। খুলনা রেঞ্জে ৪৪০ কুইন্টাল, চাঁদপাই রেঞ্জে ২৮৮ কুইন্টাল এবং শরণখোলা রেঞ্জে ১৩৩ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।

.

মধু আহরণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে মৌয়ালের সংখ্যা হ্রাস। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজারে। আর চলতি বছর বনে গেছেন মাত্র ৩ হাজার ৪৭৯ জন মৌয়াল। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে মৌয়ালের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

.সুন্দরবনের গহিন থেকে মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর গল্প.

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বনদস্যুদের আতঙ্কে অনেক মৌয়াল এবার বনে যাননি। চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা রেঞ্জে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বেঙ্গল টাইগারের হামলায় বাবলু গাজী (৪৮) নামে এক মৌয়াল গুরুতর আহত হন। তবে মৌয়ালদের ভাষ্য, বাঘের চেয়ে তাঁদের বড় আতঙ্ক বনদস্যুরা।

খুলনার কয়রা উপজেলার মৌয়াল মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেইকেই সুন্দরবনে মধু কাটতি যাই। বাঘ-কুমিরের ভয় কোনোদিন পাইনি। কিন্তু এবার ডাকাতির চাপ মেলা বেশি হুইলো। তাই আর বনে যাতি পারিনি, এলাকায় দিনমজুরির কাজ করিছি।’

.
গত বছর ১১ ড্রাম মধু পাইছিলাম। এবার পাইছি মাত্র চার ড্রাম। বনে মধুর চাক এবার খুবই কম। এরাম অবস্থা থাকলি আগামী মৌসুমে আর বনে যাওয়া সম্ভব হবি না।
জাহিদুল সানা, মৌয়াল
.

কয়রার গোবরা গ্রামের মৌয়াল জাহিদুল সানার ভাষ্য, ১১ সদস্যের একটি দল নিয়ে বনে যাওয়ার পর তাঁদের একজনকে জিম্মি করে বনদস্যুরা। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। পরে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়। তিনি বলেন, ‘গত বছর ১১ ড্রাম মধু পাইছিলাম। এবার পাইছি মাত্র চার ড্রাম। বনে মধুর চাক এবার খুবই কম। এরাম অবস্থা থাকলি আগামী মৌসুমে আর বনে যাওয়া সম্ভব হবি না।’

বন বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে মৌয়ালের সংখ্যা হ্রাস বড় ভূমিকা রেখেছে। খুলনা রেঞ্জে গত বছর এক হাজার ১৪৯ জন মৌয়াল ৫৭৪ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করেছিলেন। এবার ৮৮১ জন মৌয়াল সংগ্রহ করেছেন ৪৪০ কুইন্টাল। একইভাবে শরণখোলা রেঞ্জে গত বছর ৬৯৯ জন মৌয়াল ৩৪৯ কুইন্টাল মধু আহরণ করলেও এবার ২৬৭ জন মৌয়াল সংগ্রহ করেছেন ১৩৩ কুইন্টাল। দুই রেঞ্জেই মাথাপিছু গড় আহরণ প্রায় একই থাকায় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে মৌয়ালের সংখ্যা কমাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

.

শুধু বনদস্যুদের আতঙ্ক নয়, পরিবেশগত কারণও মধু উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, মধু আহরণ মৌসুমের আগে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সুন্দরবনের গাছে বেশি ফুল ফোটে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় ফুলের পরিমাণও কমছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ফুল ফুটলেও দ্রুত ঝরে পড়ছে। ফলে মৌমাছি আগের মতো মধু সংগ্রহ করতে পারছে না।

মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে সুন্দরবনে খলিশা ও গরান ফুলের মধু পাওয়া যায়। এরপর কেওড়া এবং পরে বাইন ও বিভিন্ন মিশ্র ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে খলিশা ফুলের মধুর চাহিদা ও দাম সবচেয়ে বেশি।

.
দস্যু আতঙ্ক ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বননির্ভর মানুষের জীবিকা ও সম্ভাবনাময় মধুর বাজার—দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তরিকুল ইসলাম, সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি
.

কয়রা উপজেলার মধুর পাইকারি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের দাবি, উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে মধুর দাম বেড়েছে। চলতি মৌসুমে খলিশা ও গরান ফুলের মধু প্রতি মণ ৩২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২৫ হাজার টাকা। কেওড়া ফুলের মধু প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার টাকায়, গত বছর যার দাম ছিল ২৪ হাজার টাকা। বাইন ও মিশ্র ফুলের মধুর দাম উঠেছে ২১ হাজার টাকায়, যা গত বছর ছিল ১৮ হাজার টাকা।

.জিআই স্বীকৃতি: ‘বিশ্বে বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধুর নতুন ব্র্যান্ডিং হবে’.

সুন্দরবনের মধু জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানান সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, দস্যু আতঙ্ক ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বননির্ভর মানুষের জীবিকা ও সম্ভাবনাময় মধুর বাজার—দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

.

সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর আমার রেঞ্জে ৬৯৯ জন মৌয়াল মধু আহরণে গিয়েছিলেন। এবার গেছেন মাত্র ২৬৭ জন। ফলে মধু সংগ্রহ ও রাজস্ব আয়—দুটিই কমেছে।’

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে কোস্টগার্ড, র‍্যাব, পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান নিয়মিত চলছে। আশা করা হচ্ছে, এসব উদ্যোগের ফলে আগামী মৌসুমে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।