খেলার মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে এক চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ।

ফিফা বরাবরই দাবি করে, ফুটবল একটি নিরপেক্ষ জায়গা। এটি রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে সব জাতি ও মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ এক ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এনেছে। এবারের আসর দেখিয়ে দিল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে কারা ভ্রমণ করবে, খেলবে কিংবা প্রতিনিধিত্ব করবে, তা এখনো নির্ধারণ করে ভূরাজনীতিই।

বিশ্বকাপের শুরুর সপ্তাহগুলোতেই মার্কিন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে খেলাধুলার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। রেফারিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী পেশাদারদের ডিপোর্ট করা হয়েছে এবং কর্মকর্তারা ভিসা–জটিলতায় পড়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিনিধিদল ইমিগ্রেশনে হয়রানির শিকার হয়েছে এবং সমর্থকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

.

সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনাটি ঘটেছে হাইতির জাতীয় দলের ক্ষেত্রে। ফিফা তাদের জার্সি থেকে ‘ভার্টিয়েরেসের যুদ্ধ’-এর স্মৃতিচিহ্ন বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এটি ছিল হাইতিয়ান বিপ্লবের সেই চূড়ান্ত যুদ্ধ, যা ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের বুকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছিল।

রাজনৈতিক অভিব্যক্তি নিষিদ্ধ করার নীতি দেখিয়ে এ সিদ্ধান্তকে জায়েজ করেছে ফিফা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দাসত্ব ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস কবে থেকে খেলাধুলার জন্য হুমকি হয়ে উঠল?

একদিকে হাইতির ঔপনিবেশিকতাবিরোধী প্রতীক সেন্সর করেছে ফিফা, অন্যদিকে বিশ্বকাপের মূল আয়োজক দেশের চাপিয়ে দেওয়া নানা বিধিনিষেধ নিয়ে তারা রহস্যজনকভাবে নীরব।

আফ্রিকার অন্যতম সেরা ফুটবল রেফারি সোমালিয়ার ওমর আবদুলকাদির আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। অথচ ফিফা আগেই জানিয়েছিল, ভিসাসংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ফলে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।

.বিশ্বকাপ ২০২৬: স্পন্সরশিপের আড়ালে যে রাজনীতি লুকিয়ে আছে.

আফ্রিকান প্রতিনিধিদলগুলো অতিরিক্ত তল্লাশি, বিলম্ব ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছে। ইরাক জাতীয় দলের অফিশিয়াল আলোকচিত্রীকে ভিসা দেওয়া হয়নি। খেলোয়াড়, সমর্থক ও অ্যাক্রিডিটেড কর্মীরাও এমন সব অভিবাসনের বেড়াজালে পড়েছেন, যা বিশ্বকাপের সর্বজনীন রূপের সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।

সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি ইরান। দেশটির প্রতিনিধিদলের ১৫ সদস্যকে ভিসা দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে দলটিকে তাদের অনুশীলনের ঘাঁটি অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় নিতে হয়েছে।

ইরান ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা দলের প্রস্তুতি ব্যাহত করেছে এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যকার সমতার নীতি লঙ্ঘন করেছে।

ফিলিস্তিনও এর ভুক্তভোগী। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিবরিল রাজৌব ফিফার অফিশিয়াল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য ভিসা পেতে বিলম্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। রাজৌবের মতে, এ আচরণ আয়োজক দেশের প্রতিশ্রুতিকে ক্ষুণ্ন করে এবং বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চরিত্রকে নষ্ট করে।

এসব ঘটনার মুখে ফিফার জবাব ছিল খুবই চেনা ও অনুমিত। তারা জানিয়েছে, অভিবাসন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব এখতিয়ার। তবে এই অজুহাত মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

.বিশ্বকাপ ২০২৬: বাকিদের বেলায় সমালোচনা, আমেরিকা হলেই চুপ.

ফিফা যখন প্রয়োজন মনে করে, তখন ঠিকই হস্তক্ষেপ করে। তারা বিভিন্ন ফেডারেশনকে শাস্তি দেয়, রাজনৈতিক বক্তব্য সেন্সর করে, জার্সি নিয়ন্ত্রণ করে এবং আচরণের কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেয়। অথচ নিষেধাজ্ঞা যখন কোনো বড় পশ্চিমা শক্তির কাছ থেকে আসে, তখন ফিফার সেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা’ রাতারাতি নিষ্ক্রিয়তায় রূপ নেয়।

এই পক্ষপাতিত্ব অবশ্য নতুন কিছু নয়।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নির্মিত অবৈধ ইসরায়েলি বসতির ফুটবল ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবে এই বসতিগুলোকে অবৈধ বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই ক্লাবগুলো ইসরায়েলি ফুটবলকাঠামোর অধীনে স্বাভাবিকভাবেই খেলে যাচ্ছে। ফিফা তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

.
হাইতি থেকে ইরান, ফিলিস্তিন থেকে সোমালিয়া কিংবা ইরাক থেকে পশ্চিম সাহারা—২০২৬ বিশ্বকাপ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ঔপনিবেশিকতা, দখলদারত্ব, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিকভাবে উপেক্ষিত মানুষগুলো এমন সব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা সবার জন্য সমান নয়।
.

অন্যান্য ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও একই নীরবতা দেখা যায়। মরক্কো ১৯৭৫ সাল থেকে পশ্চিম সাহারার বড় অংশ দখল করে রেখেছে। অথচ তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতা করছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতি দেওয়া গণভোট আজও হয়নি। সাহরাউই জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অধিকার থেকে আজও বঞ্চিত।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তথাকথিত ‘ক্রীড়ানিরপেক্ষতা’ প্রায়ই একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রান্তিক মানুষের প্রতীক, স্মৃতি ও কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। অথচ বড় কোনো শক্তি বা তাদের কৌশলগত মিত্রদের স্বার্থের কথা এলে এই নিয়ম অবিশ্বাস্য রকম নমনীয় হয়ে যায়।

ফুটবল কখনোই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বিশ্বকাপ সব সময়ই ক্ষমতার লড়াই, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এ বাস্তবতাকে স্বীকার করায় কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই হয়, যখন নিরপেক্ষতার বুলি আউড়ে প্রভাবশালী শক্তির অধিকার লঙ্ঘন পার পেয়ে যায়, আর ক্ষমতার চ্যালেঞ্জকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ রোধ করা হয়।

.

হাইতি থেকে ইরান, ফিলিস্তিন থেকে সোমালিয়া কিংবা ইরাক থেকে পশ্চিম সাহারা—২০২৬ বিশ্বকাপ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ঔপনিবেশিকতা, দখলদারত্ব, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিকভাবে উপেক্ষিত মানুষগুলো এমন সব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা সবার জন্য সমান নয়।

ফিফা যদি সত্যিই দাবি করতে চায় যে ফুটবল–বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে, তবে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে এই নীতি সব জাতি ও মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

তা না হলে এই বিশ্বকাপ হয়তো শুধু গোল আর ট্রফির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে না। এটি এমন এক টুর্নামেন্ট হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবে, যেখানে খেলাধুলার সর্বজনীনতা হার মেনেছিল সীমানা, খামখেয়ালি নিষেধাজ্ঞা আর প্রভাবশালী শক্তির ভূরাজনীতির কাছে।

  • সাঈদ মার্কোস তেনোরিও একজন ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। মিডলইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।