গত সপ্তাহে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সেক্রেটারি হিলারি বেন এই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কারও গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে যদি আপনি তাকে আক্রমণ করেন, তবে একে বর্ণবাদী গুন্ডামি ছাড়া আর কী বলবেন?’ কথাটি সত্যি। কিন্তু বেলফাস্টে দাঙ্গাবাজেরা যেভাবে মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে, তাকে অন্য একটি নামেও ডাকা যায়। তবে সরকারের মন্ত্রীরা মুখে সেই নামটি আনতে পারছেন না। নামটি হলো—সন্ত্রাসবাদ।

সেখানের সহিংসতা পুরোপুরি সরকারের নিজস্ব সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়। সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত বা আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জনগণকে আতঙ্কিত করতে সহিংসতা ব্যবহার বা হুমকি দেওয়া’ হলো সন্ত্রাসবাদ। এর মধ্যে ‘ব্যক্তির ওপর গুরুতর সহিংসতা’ এবং ‘সম্পত্তির বড় ক্ষতি’ অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সম্পত্তির ধারাটার সঙ্গে এটা মেলানো ঠিক নয়। তবে যা–ই হোক না কেন, বেলফাস্টের হামলাকে কোন যুক্তিতে সন্ত্রাসবাদ বলা যাবে না?

.

অথচ মন্ত্রীরা এই ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি তুলে রেখেছেন কেবল গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদকারীদের জন্য। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের বিক্ষোভের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সরকারি সংজ্ঞা মেলানো বেশ কঠিন। অথচ এই নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থনে প্ল্যাকার্ড ধরার কারণে এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্যদিকে বেলফাস্ট বা সাউদাম্পটনের দাঙ্গাবাজদের কারও বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়নি। এমনকি যারা অনলাইনে এই দাঙ্গা উসকে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সত্যি বলতে, উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলাই হয়নি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে—আপনি যদি বলেন ‘আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি’, তবে আপনার জেল হতে পারে। আর আপনি যদি বর্ণবাদী দাঙ্গায় উসকানি দেন, তবে আপনাকে টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ডাকা হতে পারে।

.
বিচার বিভাগ ও সরকার উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসীদের চেয়ে বামপন্থী ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে বেশি কঠোর। তাই বলা যায়, কাগজে-কলমে এটি লেবার পার্টির সরকার হতে পারে, কিন্তু কাজের দিক থেকে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, এটি আসলে ডানপন্থী কর্তৃত্ববাদী সরকার।
.

গত সপ্তাহে আপিল আদালত প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এই রায় সরকারের দেওয়া সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার বিপজ্জনক পরিধি এবং এর বৈষম্যমূলক প্রয়োগকে স্পষ্ট করে দেয়। মানবাধিকার সংস্থা ‘লিবার্টি’ ঠিকই বলেছে, এই রায়ের ফলে এটি আরও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে যে সম্পত্তি লক্ষ্যবস্তু করা কোন আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদ বলা হবে আর কোনটিকে বলা হবে না। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, এর কিছু সদস্য দুটি যুদ্ধবিমানে স্প্রে-পেইন্ট করেছিলেন।

এর বিপরীতে, বেলফাস্ট ও সাউদাম্পটনের দাঙ্গাবাজদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। তারা পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে আঘাত করতে চেয়েছিল। তাদের অনেকে বেশ সংগঠিত ছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা এমন বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছেন, যারা এই সহিংসতা উসকে দিয়েছে। কিন্তু সরকারের নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকায় এদের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না।

.

তাই হিলারি বেনের সেই প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। আমরা যা দেখছি, তাকে আর কী নামে ডাকা যায়? এর আরেকটি সহজ উত্তর হলো: এখানে দুই ধরনের বিচার চলছে। ডানের জন্য এক নিয়ম, বামের জন্য অন্য নিয়ম। কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাকটিভিস্টরা ৪৫ বছর ধরে এই ‘দুই স্তরের বিচার’ বা পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থার কথা বলে আসছেন। দাঙ্গাবাজ ডানপন্থীরা এই শব্দটি হাইজ্যাক করার চেষ্টা করলেও সত্যটা আড়াল করা যাবে না। দুই স্তরের বিচারব্যবস্থা আজ আমাদের সামনে দৃশ্যমান। তবে এই ব্যবস্থার জাঁতাকলে ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে কম।

বিচার বিভাগ ও সরকার উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসীদের চেয়ে বামপন্থী ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে বেশি কঠোর। তাই বলা যায়, কাগজে-কলমে এটি লেবার পার্টির সরকার হতে পারে, কিন্তু কাজের দিক থেকে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, এটি আসলে ডানপন্থী কর্তৃত্ববাদী সরকার।

  • জর্জ মনবিওট গার্ডিয়ান–এর কলামিস্ট

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত