বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়; যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না।’ কথাটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। শিশুরা পৃথিবীর নবীনতম সদস্য। পৃথিবীকে তারা চিনতে শেখে শব্দ, রং, ছন্দ ও কল্পনার মাধ্যমে। পরিবারের বাইরে স্কুলই শিশুর প্রথম প্রতিষ্ঠান। তাই সেই স্কুলের সঙ্গে তাদের পথচলার অনুষঙ্গ হওয়া উচিত হাসি, আনন্দ, সুর আর ছন্দ। ক্রীড়া, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা শিক্ষাকে আনন্দময় করে, মানুষের মনকে প্রসারিত করে, সহমর্মিতা শেখায় এবং ভিন্নমত গ্রহণ করতে উদ্বু্দ্ধ করে। আর এর অভাবে সমাজে সংকীর্ণতা আর অসহিষ্ণুতা জন্ম নেয়।
দুঃখজনক হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য খুব মানবিক এই প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; কিংবা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো শিক্ষার মূলধারায় স্থান লাভ করেনি, সামগ্রিকতাও পায়নি।
ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা আনন্দময় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর এখন এর চড়া মূল্য দিচ্ছি আমরা। ক্রীড়া, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের একটি বড় অংশ সংকীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা আর কূপমণ্ডূকতার প্রতিনিধি হিসেবে তৈরি হয়েছে।
.আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না; বরং তারা হবে মানবিক, নান্দনিক, আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী। পূর্ণরূপে বিকশিত আর আনন্দিত শৈশবই পারে আগামী দিনের সহনশীল, মানবিক ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে। আমরা সেই প্রজন্মের পথ চেয়ে আছি। তাই চিত্র, গীতি, সুর ও ছন্দে বিকশিত হোক আমাদের প্রতিটি শিশুর শৈশব।.
এমনই এক বাস্তবতায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠক্রমে সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা, চারু ও কারুকলা এবং ক্রীড়াকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে ক্ষয়ে যাওয়া সময়ে একধরনের আশার বার্তা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির জন্য শিল্প ও সংস্কৃতি পাঠ্যবইে চারটি অধ্যায়ে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাট্যকলা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলামে এ বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে তিনি শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সাহসী।
তবে আশার এ বার্তা সামনে আসতে না আসতেই শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাতীয় সংসদে এক সদস্যের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ের শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অসম্মতি রয়েছে; যদিও সম্প্রতি তিনি আবার জানিয়েছেন সংগীতশিক্ষক নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদের অসম্মতির তথ্যটি সঠিক নয়।
.তিনি এ বিষয়ে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করে শিক্ষকঘাটতির বাস্তবতাকে সামনে আনেন। তিনি শিক্ষকঘাটতি নিরসনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন শিল্পকলা একাডেমির সহায়তার পরিকল্পনার কথা জানান; যার মাধ্যমে একাডেমির শিক্ষকেরা ক্লাস্টার ভিত্তিতে উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সংগীত শিক্ষা দেবেন। তাঁর এ পরিকল্প কতটা প্রাসঙ্গিক, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ শিল্পকলা একাডেমিই অবকাঠামোগত ও জনবলসংকটে ভুগছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমান্বয়ে সংস্কৃতি ও সংগীত বিভাগ চালু করা এবং সেখান থেকে শিক্ষক পাওয়ার যে পরিকল্পনার কথা শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, তার বাস্তবায়ন অতি দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা।
এ ক্ষেত্রে বলা প্রাসঙ্গিক, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘সংগীত’ ও ‘শারীরিক শিক্ষা’ শিক্ষক পদ দুটি সৃষ্টির যে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল, নানা বিতর্কের মুখে তা বাতিল হয়ে যায়। ফলে সরকারের সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতিকে অনেকেই একটি প্রয়োজনীয় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও কাঠামোগত প্রস্তুতি ছাড়া বিষয়গুলো মূল কারিকুলামে সংযোজনের উদ্যোগটি কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে যায়।
.এর মধ্যেই কিছু গোষ্ঠী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সংগীত ও খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার বিরোধিতা করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলেছে। আশার কথা, সরকার এখন পর্যন্ত তার অবস্থানে অনড়। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টাও আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস নামে চারটি নতুন পাঠ্যবই আসার কথা জানিয়েছেন। আশা করি, কোনো চাপ কিংবা বিক্ষোভের মুখে সরকার তার এ অবস্থান থেকে সরে যাবে না।
কর্মজীবনে বেশ কয়েকটি বছর ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে প্রত্যক্ষ করেছি, স্কুলে খেলাধুলা, গান-নাচ-আবৃত্তি কিংবা বইপড়ার মতো বিষয়গুলো শিখন-শিক্ষণপ্রক্রিয়াকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে প্রান্তিকতা আর ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গান, নাচ, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা কিংবা গল্প বলার মতো চর্চাগুলো স্কুলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে, আত্মবিশ্বাসী করে, পাঠে মনোযোগ বাড়ায়, সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা বাড়ায়। ফলে শিখন-শিক্ষণ অর্থবহ ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। এসব কার্যক্রম ব্যতিরেকে ব্র্যাকের উপ-আনুষ্ঠানিক স্কুল শিক্ষা মডেল পৃথিবীতে এত অনুকরণীয় ও আদরণীয় হয়ে উঠতে পারত কি না সন্দেহ!
.বিশ্বজুড়ে এখন শিক্ষায় ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং’, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা এবং যোগাযোগ দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের পৃথিবীতে অনেক বেশি প্রয়োজন কল্পনাশক্তি, সহমর্মিতা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান এবং দলগতভাবে কাজের দক্ষতা। সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা ও চারুকলা এই দক্ষতাগুলো বিকাশের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।
এখন প্রত্যাশা, সরকার যেন কোনো ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক চাপের মুখে তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না আসে। কারণ, এটি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা কিংবা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান রাখবে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান খুব প্রয়োজন। যতই উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হোক না কেন, শিশুরা সঠিকভাবে বিকশিত না হলে সব আয়োজনই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না; বরং তারা হবে মানবিক, নান্দনিক, আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী। পূর্ণরূপে বিকশিত আর আনন্দিত শৈশবই পারে আগামী দিনের সহনশীল, মানবিক ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে। আমরা সেই প্রজন্মের পথ চেয়ে আছি। তাই চিত্র, গীতি, সুর ও ছন্দে বিকশিত হোক আমাদের প্রতিটি শিশুর শৈশব।
নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী






