তাঁদের তিনজনেরই বয়স তিরিশের বেশি। তারকা হিসেবে তাঁরা বড় কেউ নন, নিজ দেশের বাইরে খুব বেশি মানুষও হয়তো তাঁদের চেনেন না। হয়তো এই বিশ্বকাপের পর তাঁদের নিয়ে আর কথা হবে না তেমন, এমনও হতে পারে এটাই হয়তো বিশ্বমঞ্চে তাঁদের ‘লাস্ট ড্যান্স’। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্বকাপের তারাভরা আকাশে মেসি–এমবাপ্পেদের পাশে তাঁরাও জ্বলছেন নিজের আলোয়। এমন তিনজনকে আলাদা করে নিলে সেই নাম তিনটি হতে পারে—ভোজিনিয়া, এলয় রম ও আলীরেজা বেইরানভান্দ। খেলছেন ‘ছোট’ দলের হয়ে, কিন্তু পারফরম্যান্সে হয়ে উঠেছেন অনেক বড়।
এই বিশ্বকাপে তারকা গোলকিপারের সংখ্যা নেহাত কম নয়। মানুয়েল নয়্যার, থিবো কোর্তোয়া, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, আলিসন বেকার...চাইলে এমন আরও বলা যায়। হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলতে পারেন তাঁরা সবাই বড় দলের গোলকিপার, তাঁদের তো তেমন পরীক্ষাই দিতে হয়নি এখনো। তাতে কি ভোজিনিয়াদের কৃতিত্ব ম্লান হয়ে যায় নাকি!
শুরুটা ভোজিনিয়াকে দিয়েই হোক। কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে দ্বীপের এই গোলরক্ষকের পেশাদার ফুটবলই শুরু হয়েছে ২৫ বছর বয়সে। আঙ্গোলা থেকে মলদোভা, সাইপ্রাস থেকে স্লোভাকিয়া—১৯ বছরের যাযাবর ক্যারিয়ারটা ছিল ঘটনাবহুল। এই বিশ্বকাপে আলোচনায় এসেছেন প্রথম ম্যাচেই স্পেনের বিপক্ষে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁর মায়ের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা যাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। পরে ভিসা পেয়ে মা এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, দেখেছেন উরুগুয়ের বিপক্ষে ছেলের খেলা। মাকে হতাশ করেননি ভোজিনিয়া, ড্র করেই মাঠ ছেড়েছে তাঁর দেশ কেপ ভার্দে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর ভোজিনিয়া মাঠ ছেড়েছিলেন চোখের জলে। দাদা–দাদির কাছে বড় হয়েছেন ছোটবেলায়, কিন্তু নাতির বিশ্বকাপে খেলাটা আর দেখে যেতে পারলেন না তাঁরা। তবে ভোজিনিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর মধ্যেই ‘ভাইরাল’। বিশ্বকাপের আগে যাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল ৪০ হাজার, এখন তাঁকে অনুসরণ করে এক কোটির বেশি লোক।
৪০ বছর ১২ দিন বয়সী ভোজিনিয়া আরেকটা রেকর্ডও গড়েছেন, নিজের দেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলা সবচেয়ে বয়সী খেলোয়াড়। এই রেকর্ডটা এর আগে মাত্র এক দিনের জন্য ছিল যাঁর, তিনিও গ্লাভস হাতে এই বিশ্বকাপে আরেক প্রাচীর। ৩৭ বছর বয়সী কুরাসাও গোলরক্ষক এলয় রমকে হয়তো আপনি চিনতেন না, পরশু ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচের পর চিনেছেন নিশ্চিতভাবেই। ওই ম্যাচে করেছেন ১৬টি সেভ—বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৯০ মিনিটের ম্যাচে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। রম সেদিন বলছিলেন, মাঠে নামার পর এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পেয়ে বসেছিল তাঁকে, কেন যেন মনে হচ্ছিল সেদিন তাঁকে ভেদ করে গোল করার সাধ্য আর কারও নেই। ভোজিনিয়ার মতোই ‘ভাইরাল’ হয়ে গেছেন রমও, এক দিনের মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী এক লাখ থেকে বেড়ে হয়ে গেছে ১০ লাখের বেশি। অথচ তাঁর দেশ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যাই মাত্র দেড় লাখ!
ইরানের জনসংখ্যা অবশ্য এর চেয়ে অনেক বেশি, তবে বেইরানভান্দ অনন্য অনেক কারণে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সাতটি সেভ করে হয়েছেন ম্যাচসেরা। বিশেষ করে ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক’ দূরত্ব থেকে যেভাবে বেলজিয়ামের ম্যাক্সিম ডি কুইপারের শট ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেটি ঢুকে গেছে এই বিশ্বকাপের সেরা সেভগুলোর ছোট্ট তালিকায়। জীবনটাও কী সংগ্রামী! কিশোর বয়সে যখন জীবিকার অন্বেষণে তেহরানে এসেছিলেন, পকেট শূন্য, থাকার জায়গা নেই। কুর্দি যাযাবর পরিবারের ছেলে বেইরানভান্দ নাফত তেহরান ক্লাবের গেটের সামনে ঘুমাতেন, গাড়ি ধোয়ার কাজ করতেন, কখনোবা পিৎজার দোকানে। একদিন ক্লাব তাঁকে সুযোগ দিল। এরপর যেমন বলা হয়, বাকিটা ইতিহাস।
বেইরানভান্দ দুটি গিনেস রেকর্ডের অধিকারী—গোলকিপারদের দীর্ঘতম থ্রো (৬১ মিটার) এবং দীর্ঘতম ড্রপকিক (৭৮ মিটার)। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেকে আগেও চিনিয়েছেন, ২০১৮ বিশ্বকাপে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি। তৃতীয় বিশ্বকাপে এসেও বেইরানভান্দ আগের মতোই দুর্ভেদ্য, দুই ম্যাচ মিলে খেয়েছেন মাত্র দুটি গোল। ইরানের সংবাদমাধ্যম তো অকারণে তাঁর সম্পর্কে লেখেনি, ‘যিনি বন্ধ করে দিয়েছেন হুরমুজ প্রণালি।’
ভোজিনিয়া–রম–বেইরানভান্দের দল ‘ছোট’, বিশ্বকাপে বেশি দূর যাওয়ার মতো নয়। তাতে কি, এর মধ্যেই তো তাঁরা হয়ে উঠেছেন এই বিশ্বকাপের তারা।






