চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী এমনই এক জায়গা। এখানে ভাঙা জাহাজের জীবন শেষ হয়। কিন্তু সেই জাহাজের হাজারো জিনিসের শুরু হয় নতুন জীবন। অনেকের কাছে ভাটিয়ারী কম খরচে ঘর সাজানোর বিকল্প ঠিকানা।

.

বিশাল একটি জাহাজের স্টিয়ারিং। পাশেই পুরোনো দিনের টেলিফোন। একটু দূরে ঝুলছে বিদেশি ঝাড়বাতি। দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা কাঠের আলমারি। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে যেতে যেতে মনে হয়, যেন এক বিশাল জাহাজের ভেতর হাঁটছি।

চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী এমনই এক জায়গা। এখানে ভাঙা জাহাজের জীবন শেষ হয়। কিন্তু সেই জাহাজের হাজারো জিনিসের শুরু হয় নতুন জীবন। ভাটিয়ারীর ছোট-বড় অর্ধশতাধিক দোকান ঘুরে বিস্মিত হতে হলো। ঘর সাজানোর যা কিছু লাগে, তার প্রায় সবই আছে। খাট আছে। সোফা আছে। ডাইনিং টেবিল আছে। টেলিভিশন আছে। ফ্রিজ আছে। শোপিস আছে। আছে দূরবীক্ষণ যন্ত্র, পুরোনো কম্পাস, বিদেশি চিত্রকর্ম।

দোকানিরা মজা করে বলেন, ‘ঘর বানাতে টাকা থাকলেই হবে। বাকি সবকিছু ভাটিয়ারীতে পাওয়া যাবে। অনেকের কাছে ভাটিয়ারী কম খরচে ঘর সাজানোর বিকল্প ঠিকানা।’

.বাটিক কিনতে রসমালাইয়ের দেশ কুমিল্লায় যাবেন নাকি.

ভাঙার জন্য কোনো জাহাজ ইয়ার্ডে পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই বসে নিলাম। জাহাজের কাঠামো থেকে শুরু করে আসবাব, বৈদ্যুতিক তার, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ফটোকপি মেশিন—সবকিছুই নিলামে ওঠে। বড় ব্যবসায়ীরা সেসব কিনে নেন। পরে ট্রাকভর্তি মালামাল এসে পৌঁছায় ভাটিয়ারীর দোকানগুলোয়। সব পণ্যই বিদেশ থেকে আসে। ফলে এই বাজারে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ফ্রান্স থেকে জাপান, কোরিয়া থেকে গ্রিসে পৌঁছে যাবেন, টেরও পাবেন না।

.

মাদাম বিবির হাটের একটি দোকানের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো। দোকানটির নাম কে এম মেরিন। বাইরে থেকে সাধারণ দোকান মনে হলেও ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিচিত্র সব জিনিসের সমাহার। মাথার ওপর ঝুলছে সারি সারি ফ্যান। এক পাশে রাখা ওয়াশিং মেশিন। অন্য পাশে টেলিভিশন। তাকজুড়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের নানা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম।

.

দোকানের কর্ণধার খোরশেদ আলম একটি ফ্যান নামিয়ে হাতে তুলে দেখালেন। ধুলা ঝেড়ে বললেন, ‘এটা ফ্রান্সের একটি কোম্পানির ফ্যান। জাহাজ থেকে নিয়েছি। এমন আরও ১৭টি ফ্যান আছে। প্রতিটির দাম আড়াই হাজার টাকা।’ কয়েক কদম দূরে রাখা ৪৩ ইঞ্চি একটি টেলিভিশনের দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এটাও জাহাজের মাল। দাম ২৫ হাজার টাকা।’

.উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রো স্টেশনে কী কী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, দেখে নিন.

পাশেই সারি করে রাখা ওয়াশিং মেশিন। এখনো লেগে আছে পুরোনো স্টিকারের ছাপ। চার হাজার টাকা থেকে দাম শুরু। আরেকটু সামনে এগোতেই শোপিসের রাজ্য। কাঠের তৈরি ছোট ছোট জাহাজ। পিতলের বাতি। পুরোনো দেয়ালঘড়ি। ফুলদানি। বিদেশি চিত্রকর্ম। কিছু জিনিস দেখে মনে হয়, এগুলো কোনো অভিজাত বাড়ির ড্রয়িংরুমে থাকার কথা। অথচ সেগুলো পড়ে আছে ভাটিয়ারীর দোকানে।

.

১২ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে আছেন মোহাম্মদ হৃদয়। তিনি বললেন, ‘অনেক মানুষ জিনিস কিনতে আসেন। আবার অনেকে শুধু দেখতে আসেন। একটা ফ্যান, একটা ঘড়ি বা একটা ছবির পেছনের গল্প শুনতেও তাঁদের ভালো লাগে। আসলে একেকটা জিনিসের সঙ্গে একেকটা সমুদ্রযাত্রার গল্প জড়িয়ে থাকে।’

.

কথা বলতে বলতে হৃদয় দেয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো ঘড়ির দিকে তাকালেন। ঘড়িটি কোনো এক বিদেশি জাহাজে বছরের পর বছর সময় গুনেছে। এখন সেটি নতুন কোনো ঘরের দেয়ালে ওঠার অপেক্ষায়।

.যে মার্কেটে খুব কম দামে পাবেন ছোটদের নানা রকম খেলনা.

চট্টগ্রাম নগর থেকে এসেছিলেন হাসিবুল ইসলাম। উদ্দেশ্য ছিল ছেলের হোস্টেলের জন্য একটি ফ্রিজ কেনা। কিন্তু ভাটিয়ারীতে এসে পরিকল্পনা বদলে গেল। এক দোকান থেকে আরেক দোকান। ফ্রিজ দেখতে দেখতে চোখ আটকে গেল কয়েকটি শোপিসে। শেষে ফ্রিজের সঙ্গে সেগুলোও কিনে ফেললেন। এই ক্রেতা বললেন, ‘এখানে শুধু একটা জিনিস কিনে যাওয়া কঠিন। কিছু না কিছু চোখে লেগেই যায়।’

.

হাসিবুলের কেনা ছোট আকারের ফ্রিজটির দাম পড়েছে আট হাজার টাকা। এই ফ্রিজ বাইরে নতুন কিনতে গেলে কয়েক গুণ বেশি খরচ হতো। হাসিবুলের মতো এমন ক্রেতা ভাটিয়ারীতে কম নন। কেউ আসেন একটি চেয়ার কিনতে, শেষে নিয়ে যান টেবিলও। কেউ খোঁজেন ফ্রিজ। ফেরেন শোপিস হাতে। দামের কারণেই মূলত এই বাজারের প্রতি মানুষের টান। যেখানে নতুন একটি ফার্নিচারের সেট কিনতে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাগে, সেখানে ব্যবহৃত কিন্তু ভালো মানের একটি সেট ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়।

.মশানিরোধক নেট কোথায় পাবেন, খরচ কেমন.

প্রায় ছয় দশক আগে ঘূর্ণিঝড়ে পড়ে সীতাকুণ্ড উপকূলে আটকে যায় একটি গ্রিক জাহাজ। সেটি দেখতে ভিড় জমিয়েছিল স্থানীয় লোকজন। পরে জাহাজটি ভেঙে মালপত্র উদ্ধার করা হয়। তখন কেউ ভাবেনি, এ ঘটনাই একদিন বিশাল একটি শিল্পের ভিত্তি হয়ে উঠবে। তবে বাণিজ্যিকভাবে জাহাজভাঙা শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি জাহাজ ‘আল আব্বাস’ কিনে ভাঙে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস। সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের শিপব্রেকিং শিল্পের বাণিজ্যিক অধ্যায়। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে সীতাকুণ্ডের উপকূল। একের পর এক জাহাজ আসতে থাকে। গড়ে ওঠে জাহাজভাঙার ইয়ার্ড। সেই সঙ্গে জন্ম নেয় নতুন এক ব্যবসা—ভাঙা জাহাজের মালামাল কেনাবেচা।

.

তিন দশক ধরে জাহাজের পুরোনো মালামাল বেচাকেনার ব্যবসা করছেন মোহাম্মদ আবদুল হাকিম। এই ব্যবসার ইতিহাস তিনি ভালোই জানেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব আবদুল হাকিম বললেন, বছরের পর বছর ধরে এখানে ব্যবসা বড় হয়েছে। বিস্তৃত হয়েছে। উপকূলের পাশে গড়ে ওঠা ছোট ছোট দোকান হয়ে গেছে বিশাল এক বাজার। আজ সেই বাজারে হাঁটলে বোঝা যায়, জাহাজ শুধু লোহা নিয়ে আসে না; সঙ্গে করে নিয়ে নানা পণ্য। বলা চলে, জাহাজের কোনো কিছুই ফেলা যায় না।

.শপিং অ্যাডিকশন বা কেনাকাটায় আসক্তি কেন হয়, কীভাবে নিজেকে সামলাবেন