একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর সব সময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই সফর শুধু সৌজন্য বিনিময়ের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের অগ্রাধিকার, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নতুন নেতৃত্বের প্রথম বিদেশ সফর প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফর করেন চীন ও ইরানে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল ১৯৭৭ সালের ১৯ ও ২০ ডিসেম্বরে ভারতে।
পরে জিয়াউর রহমান একই বছরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে একটি সরকারি রাষ্ট্রীয় সফরে যান। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সুসংহত করার ক্ষেত্রে সেই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
.যুক্তরাষ্ট্র–চীন: দুই পরাশক্তির বিশ্বে বাংলাদেশ কী করবে.একইভাবে ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সফর ছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে। প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল ভারতে। ২৬ থেকে ২৮ মে অনুষ্ঠিত ওই সফরে তিনি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সার্কের অষ্টম শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বার্তা দেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম বিদেশ সফরের মাধ্যমে কূটনৈতিক অগ্রাধিকার প্রকাশের একটি ধারাবাহিকতা বিদ্যমান রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নতুন সরকার হয়তো প্রথম সফরের জন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের মতো কোনো পরাশক্তিকে বেছে নেবে। কিন্তু সেই পথ অনুসরণ করা হয়নি। প্রথম গন্তব্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মালয়েশিয়া, এরপর রয়েছে চীন সফর। এই সফরসূচি বাংলাদেশের নতুন সরকারের কূটনৈতিক চিন্তা ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। মালয়েশিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি সফল রাষ্ট্র। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দেশটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান।
.প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে শুধু প্রটোকলভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নতুন সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করেF.
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত। তাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নতুন সরকারের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণ একটি বড় অগ্রাধিকার। তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটি প্রতীকী বার্তাও রয়েছে। মালয়েশিয়া কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি নয়, কিন্তু এটি একটি সফল মুসলিম রাষ্ট্র। প্রথম সফরে এমন একটি দেশকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চেয়েছে যে তাদের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার শুধু ভূরাজনীতি নয়; বরং অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণ।
মালয়েশিয়ার পরপরই চীন সফরের সিদ্ধান্তও গভীর তাৎপর্য বহন করে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শিল্প খাতে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। বৃহৎ অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও চীন একটি ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব বজায় রাখে।
.মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার খুললেই হবে না, বদলাতে হবে পুরো অভিবাসনব্যবস্থা.চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে। ফলে চীন সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
তবে এই সফরগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি। বর্তমান বিশ্বে কূটনৈতিক সাফল্য শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্যও ক্রমেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা যায়।
বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে উন্নয়নশীল দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
.চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক: উদীয়মান প্রাচ্যের জোয়ারে নতুন যাত্রা.একই সঙ্গে এই সফরগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তৈরি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করতে পারে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মালয়েশিয়া ও চীন সফর একসঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। একদিকে মুসলিম বিশ্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির বাস্তববাদী প্রচেষ্টাও রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। কোনো একটি পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক অনেক সময় অন্যদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কূটনৈতিক ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নীতি নয়, বরং একটি প্রয়োজন।
.বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে এশিয়ার ভূরাজনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো বহুমাত্রিক কূটনীতি—সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু কারও ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। নতুন সরকারের সফরসূচিও সেই ধারাবাহিকতার একটি নতুন প্রকাশ বলেই মনে হচ্ছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সফল রাষ্ট্রগুলো কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো একই সঙ্গে বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কাজ করে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশও যদি একই ধরনের বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতি অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে তার আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
.সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে শুধু প্রটোকলভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নতুন সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে।
সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতটা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, কতটা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া যায় তার ওপর। শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়েই—জাতীয় স্বার্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে রক্ষা করা যায়।
যদি নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে এই সফরগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি ভারসাম্য হারিয়ে যায়, তাহলে সম্ভাবনাময় এই সূচনা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।
তবে শুরুটা যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী এবং অর্থনীতিকেন্দ্রিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা বলাই যায়।
ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব






