গৃহকর্মীরা বাংলাদেশ শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে তাঁদের অধিকারের বড় অংশই এখনো অনিশ্চিত। কর্মঘণ্টা, মজুরি, ছুটি, আইনি সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ—এসব মৌলিক বিষয়ে স্পষ্ট বিধান প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব রয়েছে। ২০১৫ সালের গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার আলোকে সময়োপযোগী বিধিমালা না হলে ২০২৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনের সুফলও বাস্তবে মিলবে না।
আজ রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন), ২০২৬-এ গৃহশ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি: ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম ইন বাংলাদেশ গবেষণাটি করেছে অধুনা বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে। ফলাফল উপস্থাপন করেন অক্সফাম বাংলাদেশের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট রওশন আক্তার।
গবেষণায় নিয়োগকর্তার দায় নির্ধারণ, গৃহশ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ, আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়োগপত্র দেওয়া এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ বা রসিদের মাধ্যমে মজুরি পরিশোধের মতো সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ বলেন, গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে শিশুদের এ পেশা থেকে দূরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, ১৪ বছরের নিচের শিশুদের গৃহশ্রমে নিয়োগ বন্ধে সরকার জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে চায়। এ জন্য একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কানাডিয়ান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট–জেন্ডার ইকুয়ালিটি) স্টেফানি সেন্ট-লরেন্ট ব্রাসার্ড বলেন, গৃহকর্মীদের জীবনমান ও মর্যাদা উন্নয়নে গবেষণার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর সৈয়দা মুনিরা সুলতানা বলেন, উন্নয়নের জন্য গৃহশ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিশুশ্রম বন্ধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দক্ষতা বাড়লে তাঁদের আয়ও বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শ্রম আইনে গৃহশ্রমিকদের আংশিক স্বীকৃতি মিললেও মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহমুদা সুলতানা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি ২০১৫ সালের নীতিমালার আলোকে কার্যকর বিধিমালা প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং শিশুশ্রম প্রতিরোধে একটি টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অক্সফাম ইন বাংলাদেশের হেড ইকোনমিক ইনক্লুশন অ্যান্ড জাস্টিস ফাতেমা তুজ জোহরাও বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে শ্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠন, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গৃহকর্মে প্রধানত নারীরা নিয়োজিত হলেও খাতটি এখনো অনানুষ্ঠানিক। ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে সীমিত আইনি সুরক্ষা যুক্ত হয়েছে। তবে এসব কার্যকর করতে ২০১৫ সালের গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার ভিত্তিতে পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি।
এ গবেষণার জন্য গৃহশ্রমিক, আইনবিশেষজ্ঞ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সাক্ষাৎকার ও দলগত আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গৃহশ্রমিকদের জন্য পৃথক ক্ষতিপূরণ বিধিমালা প্রণয়ন, একাধিক নিয়োগকর্তার ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ এবং তাঁদের কর্মসংস্থানকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিলের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ ছাড়া গেজেটের মাধ্যমে ইউনিয়নের ভৌগোলিক এলাকা নির্ধারণ, আবাসিক এলাকা ও হাউজিং সোসাইটিভিত্তিক ইউনিয়ন নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু, শ্রমিকবান্ধব বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি গড়ে তোলা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়।
এ গবেষণায় আরও বলা হয়, অধিকাংশ গৃহশ্রমিক মৌখিক চুক্তিতে নিয়োগ পান। ফলে শ্রমিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে সহজ নিবন্ধন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের তথ্য সংরক্ষণ, কাজে যোগদানের তারিখসংবলিত ফরম এবং নিয়োগের লিখিত প্রমাণ রাখার ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মজুরি ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ বা রসিদের মাধ্যমে পরিশোধের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে নিয়োগ ও শ্রমসম্পর্কিত প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে এবং বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তি সহজ হয়।






