দেশজুড়ে টিকা দেওয়ার দুই মাস পরও দেশে কমছে না হামে শিশুমৃত্যু, কমছে না সংক্রমণ। প্রতিদিন হাজারের ওপর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। হামে এত মৃত্যু আর সংক্রমণ আগে দেখা যায়নি দেশে।
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে হাম মোকাবিলার চেষ্টার কারণেই দেশে ভয়ানক সংক্রামক হামের এত বিস্তার। হাসপাতালে কিছু আইসিইউ আর চিকিৎসক রেখেই দায় সারার চেষ্টা হয়েছে। হাম প্রতিরোধে নেই প্রচার, নেই সুনির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা। কোভিডের সময়ের যে তৎপরতা, তার কিছুই এখন নেই বলে মনে করেন তাঁরা।
হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে আজ রোববার সকাল ৮টা) দেশে আরও তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তিনজনই ঢাকার। এ সময়ে সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ৬৩ শিশুর মধ্যে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬২ শিশুর।
আজ রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৫৮৭টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯৩ শিশু। মোট মৃত্যু ৬৮০।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৯২ হাজার ৭৯০ শিশুর। হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ১১ শিশুর। এ সময়ে হামে আক্রান্ত এবং হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৮০১ শিশুর।
এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬ হাজার ৮৫৯ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৭২ হাজার ৮৪৯টি শিশু বাড়িতে ফিরেছে।
গতানুতিক পদ্ধতিতে হাম মোকাবিলার চেষ্টা, তাই ব্যর্থতা
হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও এর ভয়াবহতা সরকার বুঝতে বা একে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, গতানুগতি পদ্ধতিতে মারাত্মক এই সংক্রমণ সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। বা বলতে পারি, সরকার এর ভয়াবহতাকে গুরুত্ব দেয়নি। শুধু হাসপাতালে কয়েকটি আইসিইউ, আর ডাক্তারের বন্দোবস্ত করেই দায় সারার চেষ্টা করা হয়েছে। স্তরভিত্তিক যে ব্যবস্থাপনার দরকার, তার কিছুই করা হয়নি।
হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলায় এর ব্যাপক প্রচার, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাসহ সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে জনপ্রচার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই করা হয়নি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যেসব শিশুর জ্বর হচ্ছে, তাদের আলাদা রাখতে হবে। হাত ধোয়াসহ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কিন্তু আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে তো এসব বিধি মানতে কোনো বার্তাই পৌঁছানো হয়নি। ফলে টিকা শুরুর এত পরও সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক অবস্থায় আছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, কোভিড নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে ব্যাপক প্রচার ছিল। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ছিল। বর্তমানে এর কিছুই নেই বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন একটি প্রেস রিলিজ দেওয়া ছাড়া কোভিডকালে নেওয়া ব্যবস্থাগুলোর কোনোটিই দেখা যাচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার একটি উপায় হচ্ছে টিকা ক্যাম্পেইন। অর্থাৎ, একযোগে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা। সরকার গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ২০ এপ্রিল সারা দেশে এই কার্যক্রম শুরু হয়।






