রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তার জগৎকে ভিন্নমাত্রায় তুলে ধরতে ঢাকার জার্মান সংস্কৃতি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘ফ্রম দ্য মেমোরি লেন—রবীন্দ্রনাথ টেগোরস পোয়েটিক জার্নি টু জার্মানি’।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির গ্যেটে ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান হয়।

বীণার স্নিগ্ধ সুরে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জার্মানি ভ্রমণ নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২১ সালে প্রথম, ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় এবং ১৯৩০ সালে তৃতীয়বার জার্মানি ভ্রমণের নানা স্মৃতি। পাশাপাশি জার্মানি ভ্রমণের সময় কবিগুরুর সঙ্গে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাক্ষাতের মুহূর্ত।

এরপর জার্মান ভাষায় ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ আবৃত্তি করেন গ্যেটে ইনস্টিটিউট ঢাকার পরিচালক ফ্র্যাঙ্ক ভার্নার। রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সঞ্চিতা রাখির একক সংগীত পরিবেশনা শুরু হয় ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ গাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী শিল্পী পরিবেশন করেন ‘মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি’, ‘সে কোন পাগল যায় পথে তোর’, ‘কার চোখের চাওয়ার হাওয়ায় দোলায় মন’, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে’, ‘আকাশ তোমায় কোন রূপে মন চিনতে পারে’, ‘তোর ভিতরে জাগিয়ে কে যে’, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’ গানগুলো।

আয়োজকেরা জানান, জার্মানির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক সংযোগ, তাঁর সাহিত্যচিন্তা এবং বিশ্বমানবতার দর্শনকে কেন্দ্র করে এ আয়োজন। কবির সাহিত্য ও সংগীত কেবল বাংলাভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বসংস্কৃতির পরিসরেও রয়েছে তার গভীর প্রভাব। সেই ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ আয়োজন।

সংগীত পরিবেশনা শেষে শিল্পী সঞ্চিতা রাখি বলেন, ‘এক শতাব্দীর বেশি সময় পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জার্মানি শুধু নোবেলজয়ী হিসেবেই নয়, সংস্কৃতি, শিক্ষা, শিল্প ও বিশ্বমানবতার দূত হিসেবে স্মরণ করে।’

অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন গ্যেটে ইনস্টিটিউট ঢাকার পরিচালক ফ্র্যাঙ্ক ভার্নার। তিনি বলেন, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জার্মান কবি গ্যেটে ভিন্ন সংস্কৃতির হলেও তাঁদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বিশ্বমানবতা। তিনি বলেন, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ উপনিবেশবিরোধী মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার বার্তা ছড়িয়ে দেন। বিশেষ করে জার্মানিতে ১৯১৯ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে তাঁর ২৫টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়া তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ।

গ্যেটে ইউরোপের বাইরে না গেলেও ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন বলে উল্লেখ করেন ফ্র্যাঙ্ক ভার্নার। তিনি বলেন, কবি কালিদাসের শকুন্তলার জার্মান অনুবাদ গ্যেটেকে ভারতীয় ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত করে। রবীন্দ্রনাথ ও গ্যেটে শুধু কবি নন, তাঁরা ছিলেন দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও শিল্পী—যাঁদের মানবতাবাদ, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা আজও বিশ্বসংলাপের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে আছে।