দুই ছেলে, এক ভাতিজি ও পৈতৃক বাড়ির নামে চারটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সম্প্রতি সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি নামকরণের ঘটনাকে ‘মিরাকল’ (অলৌকিক) বলে দাবি করেছেন।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এটাকে পরিবারতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে করছেন। সমালোচনার মুখে দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে ইউনিয়নের নামকরণের পাশাপাশি আরও কিছু ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে এরই মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

.

বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠন করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ১১ জুন। শিবগঞ্জ উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’। অন্যদিকে নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন তিনটি ইউনিয়নে নামকরণ করা হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।

.

অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ী’র নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।

‘স্থানীয় এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, শুধু ছেলেদের নামে নয়, লন্ডনে থাকা ভাতিজির নামেও ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজিকে স্বর্ণ বলে ডাকা হয়। তাই তাঁর নামানুসারে মোকামতলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে ‘‘স্বর্ণগ্রাম’’ ইউনিয়ন নামকরণ হয়েছে।’ (প্রতিমন্ত্রী দিলেন ডিও লেটার, নাম প্রস্তাব বিএনপি নেতার, সংসদে ‘মিরাকল’, বাংলাট্রিবিউন, ১৬ জুন ২০২৫)

প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ইউনিয়নগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় জনগণের গণশুনানি এবং মতামতের ভিত্তিতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসন যথাযথ আইন অনুসরণ করে শিবগঞ্জ উপজেলায় একটি এবং মোকামতলা উপজেলায় তিনটি নতুন ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ করেছেন। আমার দুই ছেলের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দীগন্ত। কেউ কেউ আমার ছেলেদের নামের সঙ্গে নতুন দুটি ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণের সামঞ্জস্য খোঁজার চেষ্টা করছেন। এটা মোটেও সঠিক নয়। বিষয়টি সম্পর্কে আগে থেকে আমি অবগতও নই।’

একই দিন জাতীয় সংসদে মীর শাহে আলম বলেন, ‘মিরাকেলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই।...’ (দুই ছেলের নামে দুই ইউনিয়নের নামকরণ, সংসদে দেওয়া ব্যাখ্যায় যা বললেন প্রতিমন্ত্রী, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন, ১৫ জুন ২০২৬)

.মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, আপনি নামের ফাঁদে পড়েছেন!.

ইউনিয়নগুলোর নামকরণ নিয়ে মীর শাহে আলমের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটা অগ্রহণযোগ্য। তাঁর কথা অনুসারে, বিষয়টি কাকতালীয় এবং তিনি আগে থেকে জানতেন না। তাহলে জানার পর তাঁর উচিত ছিল ইউনিয়নগুলোর নামকরণ স্থগিত করা। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। পুরো ঘটনায় পরিবারতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহার স্পষ্ট।’

ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী যখন জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা তখন টেবিল চাপড়ে তাঁকে সমর্থন জানান। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন প্রতিমন্ত্রীর এ রকম কর্মকাণ্ডে সরকারি দলের সমর্থন দেওয়া খুবই দৃষ্টিকটু। এ ঘটনা থেকে সরকারে তাঁর প্রভাবের বিষয়টি বোঝা যায়। কিন্তু এ ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘ মেয়াদে সরকার ও সরকারি দলের জন্য ক্ষতিকর হবে।’

লক্ষণীয় হলো, ওই চারটা ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর বগুড়ার প্রশাসন বলছে, গণশুনানির মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত নিয়ে নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের নথিতে যেসব স্থানে গণশুনানি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে গিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, এ ধরনের কোনো গণশুনানি হওয়ার কথা তাঁরা শোনেননি। নতুন ইউনিয়নগুলোর নামের প্রস্তাবক হিসেবে যাঁদের কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের দুজন যুবদল নেতা। (গণশুনানির কথা জানেন না সাধারণ মানুষ, নামের ‘প্রস্তাবকেরা’ যুবদল নেতা, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন, ১৮ জুন ২০২৬)

.

সমালোচনার মুখে প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা বগুড়ার দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে মৌখিক নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার সন্ধ্যায় মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান। (বগুড়ার সেই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন, ১৯ জুন ২০২৬)

প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা ইতিবাচক এবং এ জন্য তিনি ধন্যবাদ প্রাপ্য। ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়টি যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তাঁর এই নির্দেশনার মাধ্যমে তা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয়েছে। তবে চারটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হলেও এর মধ্যে তিনি দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই নির্দেশনা নিয়ে যে বিষয়টি উদ্বেগের তা হলো, এ রকম সামান্য একটি ঘটনাতেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কেন বিষয়টির সুরাহা করতে পারল না? এ রকম ‘ছোটখাটো’ বিষয়ে যদি প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে সরকারের অন্য সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

.

শুধু ইউনিয়নের নামকরণ নয়, এর পাশাপাশি আরও কিছু ঘটনায় মীর শাহে আলমকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি যে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সারা দেশে উন্নয়নের জন্য প্রকল্প বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে বিএনপি সরকারের চার মাসে সড়ক, পথ ও সেতু নির্মাণে প্রতিমন্ত্রীর নিজ উপজেলা শিবগঞ্জ সবচেয়ে বেশি ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প পেয়েছে। অন্যদিকে ৩৭৩টি উপজেলা গড়ে পেয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রকল্প। সেই হিসাবে শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে ২০টি উপজেলার সমান প্রকল্প। (উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল, নেত্র নিউজ, ১৭ জুন ২০২৬)

লক্ষণীয় হলো, প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। এ প্রতিষ্ঠানের নাম মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং বগুড়ায় বেশ কিছু ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে।

বাবা যে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেই মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি কাজ করতে পারে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটলে খুব স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ উঠবে, বাবা তাঁর প্রভাব খাটিয়ে ছেলেকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন কি না? এটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাত।’

.

অগ্রযাত্রা প্রতিদিন নামে পত্রিকায় প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীকে জড়িয়ে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে ওই পত্রিকার সম্পাদকসহ চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৫ জুন একটি মামলা করা হয়। বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক মহাস্থান পত্রিকার সম্পাদক ও বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম বাদী হয়ে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতে মামলাটির আবেদন করেন।

সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) মানহানির এ মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। সিপিজে এশিয়ার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের উচিত ওই চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করা।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানহানির মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি (যার মানহানি হয়েছে বলে দাবি করা হয়) এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ছাড়া মামলা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর মানহানির অভিযোগে একজন সাংবাদিক বাদী হয়ে অন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করায় তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

.

এ রকম প্রেক্ষাপটে বুধবার রাতে (১৭ জুন) অগ্রযাত্রা প্রতিদিন–এর সম্পাদকসহ ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়। এজাহারে চাঁদা দাবির অভিযোগও করা হয়। এরই মধ্যে অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামকে বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করে বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। শুক্রবার বিকেলে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই মামলারও বাদী তানভীর আলম।

এসব ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই বিভক্তির ফলাফল খুবই নেতিবাচক। এরই মধ্যে সাংবাদিকেরা নানাভাবে চাপের মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। (বগুড়ায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্র চাপের মুখে, সমকাল অনলাইন, ১৯ জুন ২০২৬)

  • মনজুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব