রাষ্ট্র যখন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়, তখন তার মূল উদ্দেশ্য থাকে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ মেয়াদে জনস্বার্থ নিশ্চিত করা। নদী খনন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ বা অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব প্রকল্প সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়। কিন্তু যখন সেই উন্নয়ন প্রকল্পই সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষদের শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য?
আপার ভদ্রা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় চুকনগর, কাঁঠালতলা ও বরাতিয়া এলাকার একাধিক আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবারের ঘরের ওপর নদী খননের মাটি ফেলে দেওয়া হয়েছে। কোথাও পুরো ঘর মাটিচাপা পড়েছে, কোথাও চাল, দেয়াল, দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, কোথাও শৌচাগার ও পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। ফলে কেউ গরুর হাটের মাঠে অস্থায়ী ঝুপড়ি বানিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, কেউ বাধ্য হয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই ঘটনা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীনতার ফল। স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, চুকনগর এলাকায় পাঁচ-ছয় মাস আগেই ঘর ভেঙে গেছে; অর্থাৎ প্রশাসন ও প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই কাজ চলেছে। কোথাও শুধু সামান্য ত্রাণ হিসেবে কিছু চাল দেওয়া হয়েছে, কোথাও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আশ্রয় হারানো মানুষের কাছে এসব আশ্বাস বাস্তব সংকটের কোনো সমাধান নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানোর প্রবণতা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের সঙ্গে কথা বলতে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ঠিকাদার পক্ষ বলছে, জায়গার অভাবে সময়মতো মাটি সরানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু প্রায় ১৪০ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো যাঁদের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাঁরা সমাজের সেই মানুষ, যাঁদের নিজেদের জমি বা বাসস্থান নেই বলেই সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, অন্যদিকে আরেকটি সরকারি প্রকল্প সেই ঘরই ধ্বংস করছে। এটি শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যকার এক গভীর অসংগতি।
উন্নয়নের নামে যদি প্রান্তিক মানুষ গৃহহীন হন, মৌলিক অধিকার হারান এবং মাসের পর মাস তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে বাধ্য হন, তাহলে সেই উন্নয়ন জনকল্যাণ নয়। সরকারকে অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এবং দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল প্রকল্পের ব্যয় বা অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষা।






