বাংলাদেশে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। তারপরও বিশ্বের সবচেয়ে সহজলভ্য সিগারেটের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। গবেষণা বলছে, জটিল কর কাঠামো আর কম দামই তামাক কোম্পানিগুলোকে লাভবান করছে, আর জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর সংকটের দিকে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ছোট একটি দোকানে ১০ টাকার সিগারেট কিনছিলেন কলেজপড়ুয়া এক তরুণ। পাশেই বাজার করতে আসা একজন দিনমজুর নেন বিড়ির প্যাকেট। বিড়ি–সিগারেটের বিক্রি নিয়ে দোকানি জাহিদুলকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘সবচেয়ে বেশি চলে কম দামি সিগারেট।’

এই কম দামই বাংলাদেশে সিগারেটকে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলেছে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বড় কারণ, দেশের তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা। বছরের পর বছর এমন এক করব্যবস্থা বহাল আছে, যেখানে কাগজে করহার বেশি দেখালেও বাস্তবে সিগারেটের দাম তুলনামূলক কমই থেকে যাচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। এটি দেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে।

‘ইকোনমিক কস্টস অব টোব্যাকো ইন বাংলাদেশ: অ্যান আপডেটেড এস্টিমেট ইনক্লুডিং হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ড্যামেজেস’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি।

বাংলাদেশে তামাক কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, সিগারেটে ইতিমধ্যেই অনেক বেশি কর রয়েছে। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, সমস্যা করের হারে নয়, সমস্যা কর কাঠামোয়। বর্তমানে দেশে সিগারেটে চারটি মূল্যস্তর রয়েছে—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। প্রতিটি স্তরে আলাদা দাম ও করহার। এই বহুস্তর কাঠামোর ফলে ভোক্তারা সহজেই এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যেতে পারেন। ফলে দাম বাড়লেও ধূমপান পুরোপুরি কমে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে কম দামি সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। অর্থাৎ বাংলাদেশে সিগারেট এখনো তুলনামূলক সস্তা।

বাংলাদেশে যে সিগারেট সস্তা, সে কথা সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানও স্বীকার করেন। গত ২৭ এপ্রিল এক প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, ‘এত কম দামে আমাদের আশপাশের কোনো দেশে সিগারেট পাওয়া যায় না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল তাঁর এক উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে পরিবারপ্রতি আয় বেড়েছে ১০৩ শতাংশ, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, আটা ৭৫ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১৫ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৩–২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার এখন ক্রমেই সস্তা সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তামাক কোম্পানিগুলো মূলত ভোক্তার কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়। যেমন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ২০২৪ সালে ৩৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই ভোক্তার দেওয়া পরোক্ষ কর।

বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক গবেষণা বলছে, ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্য সবচেয়ে কম—মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। সে তুলনায় ভারতে এটি ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৩৬ শতাংশ।

তামাকবিরোধী সংগঠন ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব হলো—নিম্ন ও মধ্যমস্তরের সিগারেট একত্র করে ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা করা, উচ্চস্তরের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা করা, প্রতি প্যাকেটে নির্দিষ্ট ৪ টাকা কর আরোপ, সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা।

গবেষকদের দাবি, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন, ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন, দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কার্যকর তামাক কর একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের ওপর কর বাড়িয়ে তুললে রাজস্ব আয় কমতে কমতে অন্তত ৮ থেকে ১০ বছর লাগতে পারে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধূমপায়ী করে তোলার নানা আয়োজন আছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসা করার জন্য নয়। সরকার মানুষের সেবা করার জন্য। কিন্তু রাজস্বের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রের মানুষের এমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি যেভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, তা কাম্য নয়।

অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, তামাকের ওপর কর আরোপের বিষয়টির সঙ্গে নৈতিকতা, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রাধান্যের তালিকায় থাকা উচিত।