গত কয়েক মাসে বিশ্বরাজনীতির দাবার ছক অনেকটাই বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই নির্ধারিত হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের বহু প্রতীক্ষিত বৈঠক। হোয়াইট হাউস এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—দুই পক্ষই এই বৈঠকের ঘোষণা দিয়েছে। তবে শুরু থেকেই দুই দেশের মনোভাবে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষণীয়।
আমেরিকা বারবার এই বৈঠকের গুরুত্ব তুলে ধরছে, অন্যদিকে চীন সংযত ভাষায় এটাকে ‘যোগাযোগ’ ও ‘কৌশলগত দিকনির্দেশনা’র অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে।
এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভঙ্গি আসলে বিশ্বশক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বহু দশক পর আমেরিকাকে এমন অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নিজেদের সৃষ্ট সংকট থেকে বেরোনোর জন্য চীনের উপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়েছে।
এই সংকটের মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের ব্যর্থতা। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রয়েছে। পাল্টা জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে আমেরিকার এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকলেও অনেক জাহাজকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা পড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর উপায় খুঁজছে ওয়াশিংটন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টসহ শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে চীনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। তারা চান, বেইজিং তার প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি করাক। এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। একদিকে ট্রাম্প ও রুবিও চীনের সাহায্য চাইছেন, অন্যদিকে আমেরিকার সামগ্রিক নীতি চীনের বিরুদ্ধে সংঘাতমুখী। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে টানাপোড়েন চলছে। এই দ্বন্দ্ব আমেরিকার দুর্বল অবস্থানের পরিচয় দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন দাবি করছে, এই সংকটে চীনই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন কারণ তাদের জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কিন্তু এই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চীন আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বিপুল মজুত, বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা ও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কারণে তারা এই ধাক্কা সামলে নিয়েছে। ফলে আমেরিকার আশঙ্কিত অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেনি।
আগামী কয়েক দিন শুধু আমেরিকা-চীন সম্পর্কের জন্যই নয় ইরান যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ এখন কার্যত শেষের পথে। ধৈর্য, প্রস্তুতি ও কৌশলগত সুবিধা নিয়ে চীন এই বৈঠকে অনেকটাই শক্তিশালী অবস্থানেই প্রবেশ করছে।
হরমুজ প্রণালির এই সংকটকে চীন এক ধরনের পরীক্ষা হিসেবে দেখছে, যা তারা ইতিমধ্যে পার হয়েছে। তাই তারা তাড়াহুড়ো করে আমেরিকাকে সাহায্য করতে চায় না। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় তা স্পষ্ট। চীন ইরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। এমনকি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
চীন শুধু ইরানকে চাপ দিয়ে প্রণালি খুলতে বলবে না। তারা বড় ধরনের সমঝোতার কথা ভাবছে। তাদের দৃষ্টিতে, আমেরিকাকে চাপ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা বন্ধ করানো, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বহুমুখী নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে ছোট সমাধানে সন্তুষ্ট কেন হবে?
ইরান ইতিমধ্যে যুদ্ধ থামানো ও প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে একটি প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প সেটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, অচলাবস্থা এখনো চলছে। এটি ভাঙার জন্য আমেরিকা চীনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই সংকট চীন তৈরি করেনি, কিন্তু এখন মেটানোর ক্ষমতা তাদের হাতে। তারা তা নিজেদের শর্তে করবে। এর পাশাপাশি চীনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য তাইওয়ান। চীনের ওপর ভর করে কি ইরান যুদ্ধ থেকে বেরোতে চান ট্রাম্প?
এই প্রসঙ্গও ট্রাম্প-সি বৈঠকে গুরুত্ব পাবে। ট্রাম্প দ্রুত সাফল্য চান, সি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোচ্ছেন। চীন শুধু সাধারণ কূটনীতিতে সন্তুষ্ট থাকবে না। তারা চাইবে, আমেরিকা স্পষ্টভাবে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করুক।
ট্রাম্প হয়তো তাইওয়ানকে দর-কষাকষির হাতিয়ার করতে চাইবেন। হরমুজ প্রণালি খোলা, আমেরিকার কৃষি ও জ্বালানি পণ্য কেনা বা অন্য সংঘাতে শান্তির বিনিময়ে ছাড় দিতে পারেন। কিন্তু চীন এত সহজে ফাঁদে পা দেবে না। তাদের কাছে তাইওয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার ওপর আপস করবে না।
ট্রাম্প হয়তো সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে চাইবেন। কিন্তু চীন বাস্তববাদী। বাইরে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলেও ট্রাম্পের কথায় পুরোপুরি নির্ভর করবে না। বরং আগামী কয়েক মাসে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি উত্থানে বাধা না আসে।
চীনের চিন্তা শুধু তাইওয়ানে সীমাবদ্ধ নয়। জাপানের সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়ছে এবং তাইওয়ান ইস্যুতে তারা সরব হয়েছে। চীন চাইবে, আমেরিকা তার মিত্র জাপানকে নিয়ন্ত্রণে রাখুক।
বিশ্বরাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে চীন নিজেকে দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। তারা আন্তর্জাতিক মহলকে হরমুজ–সংকট কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে। বিপরীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে—অবৈধ যুদ্ধ শুরু থেকে বিদেশি নেতাদের অপহরণ বা হত্যার মতো কাজের।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক দিন শুধু আমেরিকা-চীন সম্পর্কের জন্যই নয় ইরান যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ এখন কার্যত শেষের পথে। ধৈর্য, প্রস্তুতি ও কৌশলগত সুবিধা নিয়ে চীন এই বৈঠকে অনেকটাই শক্তিশালী অবস্থানেই প্রবেশ করছে।
ওয়েনরান জিয়াং আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।






