গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের পুনর্গঠন, জনআস্থা ফেরানো এবং পেশাদারত্ব নিয়ে আলোচনার চেয়ে সুযোগসুবিধার দাবিই এগিয়ে রয়েছে।
গত বুধবার পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ শেষ হয়েছে। চার দিনের এই অনুষ্ঠানে পুলিশের নানা দাবিদাবি যেভাবে জোরালো হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পর বিপর্যস্ত বাহিনীকে পুনর্গঠন, পেশাদারত্ব বাড়ানো, জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সেভাবে গুরুত্ব পায়নি।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অংশে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশকে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, পেশাদারত্ব বাড়বে কীভাবে, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি নেওয়া দরকার এবং জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল না।
স্বতন্ত্র পে-স্কেল, আবাসনসংকট দূর করা, বিদেশের দূতাবাস ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুলিশের পদায়নসহ নানা দাবির উপর বেশি জোর পড়েছে। পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো নিয়েও কিছু আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট কাটাতে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কর্মপরিকল্পনা বা প্রস্তাব আসেনি।
‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে গত রবিবার পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ শুরু হয়। এ সময় দেশের সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরসহ ঢাকার বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকগুলো সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুলিশের পুনর্গঠন ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পায়নি।
জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের প্রধান কাজ।আবদুল কাইয়ুম, সাবেক আইজিপি
দাবিদাবির আলোচনাই বেশি
পুলিশ সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো পুলিশের জন্যও স্বতন্ত্র বেতনকাঠামোর দাবি উঠেছে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে। কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পর্যন্ত সদস্যদের অবসরের আগে অনারারি পদোন্নতির দাবি এসেছে। আবাসনসংকট নিরসন, তদন্ত ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো, এসআইদের মোটরসাইকেল কিনতে সুদমুক্ত ঋণ, বিদেশের কয়েকটি দূতাবাসে পুলিশের পদায়ন, পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের দাবিও উঠেছে। এসব দাবির অনেকগুলো দীর্ঘদিনের এবং দরকারি। এর মধ্যে কিছু দাবি সরকার মেনেও নিয়েছে।
থানাগুলোকে আরও সেবামুখী করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, মামলার তদন্তের মানোন্নয়ন ও পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আচরণে পরিবর্তন আনার মতো বিষয় আলোচনায় তুলনামূলকভাবে আড়ালে ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, এবার পুলিশ সপ্তাহে বাহিনী কীভাবে মানুষের আস্থা ফিরে পাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা হবে; কিন্তু আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল পদোন্নতি, পদায়ন ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়।’
তবে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার এবং অপরাধ দমনে আপসহীন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
পদক স্থগিত যে কারণে
প্রতিবছর সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধনিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য পদক দেওয়া হয়। এবার পদক দেওয়ার জন্য ১১৫ জনের তালিকাও করা হয়েছিল; কিন্তু অনুষ্ঠানের আগের দিন ৯ মে রাতে পদক স্থগিতের খবর বের হয়।
এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পদকের জন্য যাঁদের নির্বাচিত করা হয়েছিল, তাঁদের অনেককে নিয়ে আপত্তি ওঠে। আবার পদক পাওয়ার যোগ্য কেউ কেউ বাদ পড়েছিলেন—এমন অভিযোগও আছে। এসব নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয় এবং বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছালে পদক দেওয়া স্থগিত করা হয়।
ডিআইজির রাজনৈতিক বক্তব্যে বিতর্ক
পুলিশ সপ্তাহের আরেকটি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিকের বক্তব্য। রাষ্ট্রের একটি পেশাদার বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েও তিনি যেভাবে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের আদর্শ ধারণের কথা বলেছেন; এ নিয়ে পুলিশের ভেতরে ও বাইরে প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সপ্তাহ একটি বাহিনীর পেশাদারত্ব, সংহতি ও নিরপেক্ষতার বার্তা দেওয়ার মঞ্চ। সেখানে ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্য বাহিনীর ভাবমূর্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এক দল গেলে আরেক দলের আদর্শ ধারণ করা যদি রেওয়াজ হয়, তাহলে পুলিশের চরিত্র বদলাবে কবে?’
পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, দুই কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্যে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও অসন্তোষ জানানো হয়েছে। পরে আইজিপি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ সপ্তাহ শেষে বাহিনীর ভেতরে এখন প্রশ্ন উঠেছে, গণঅভ্যুত্থানের অভিঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ কি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে; নাকি পুরোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতিই আবার প্রাধান্য পাবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও জনআস্থা ফেরাতে হলে পুলিশের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে দ্রুত কার্যকর কর্মপরিকল্পনা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সমাজ থেকেই পুলিশের পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। সেটি নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের প্রধান কাজ।






