জাহানুর বিবি জানেন না তাঁর বয়স কত। শৈশবের স্মৃতি বলতে তাঁর কাছে রয়েছে বাবা-মায়ের নৌকায় পাতা সংসার এবং মেঘনার জলে ভাসমান অবিরাম যাত্রা। এই নৌকাতেই তাঁর জন্ম হয়েছে। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে আরেকটি নৌকায় সংসার গড়েছেন। এখন হয়তো তাঁর বয়স ৪০ বা তার কিছুটা বেশি। পুরো জীবন কেটেছে এই জলের বুকে।
ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাটের কাছাকাছি মেঘনার তীরে জাহানুর বিবির সঙ্গে দেখা হয়। দুপুরের তীব্র রোদে তিনি একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। শিগগিরই নদীতে মাছ ধরতে যাবেন। তাঁর পরনের সুতির শাড়ির আঁচল হাতে ধরে একটি শিশু কিছু চাইছিল। আমার দিকে হেসে তিনি বললেন, “ও আমার মেয়ে, নাম কোহিনূর।” শিশুর চোখমণি দুটি হীরার মতো উজ্জ্বল, নামের সঙ্গে মানানসই তার চাহনি।
শহুরে বা গ্রামীণ মানুষদের মতো জাহানুর বিবিদের জীবনে উৎসব, আনন্দ বা বেদনা পালনের সুযোগ নেই। তাঁদের কাছে শুধু সংগ্রাম এবং টিকে থাকার লড়াই। মাছ ধরতে পারলে তা বিক্রি করে চুলায় হাঁড়ি চাপানো যায়। রোদ বা বৃষ্টির কোনো বাধা নেই। ঝড়-জল যাই আসুক, এই নৌকায় জলের বুকে ভেসে থাকতেই হয়। এই পৃথিবীতে তাঁদের কোনো স্থায়ী আশ্রয় নেই।
ইলিশা ঘাট থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রাজাপুর খাল, যা মেঘনায় পড়েছে। এখানেই এই ভাসমান জীবনের আশ্রয় হিসেবে রাত কাটান তাঁরা। এখানে শতাধিক পরিবার রয়েছে, সবাই মানতা সম্প্রদায়ের। তারা মূলত জলযাযাবর এবং নিজেদের বেদে হিসেবে পরিচয় দেন।
জাহানুর বিবি বললেন, “আমাদের জাগা নাই, জমিন নাই। কী খাইয়া বাঁচমু? মাছ ধরা ছাড়া উপায় নাই। চাইর মেয়ে, এক ছেলে আমার। স্বামী–সন্তানদের নিয়া মাছ ধরি। এই ধরেন, হাতিয়া, রামগতি, মতিরহাট—এদিকেও চলে যাই মাছ ধরতে। আশপাশে ঘাট যেখানে পাই, সেখানে বেচে দিই।”
ঝড়ের মধ্যে স্ত্রী, বাচ্চাকাইচ্চা নিয়া মরি, না বাঁচি, আল্লায় রাখবে, না লইয়া যাইবে—এর ঠিক থাকে না। একখান ঘর হইলে খুব সুবিধা হয়।
—মো. ইব্রাহিম, মেঘনা নদীতে নৌকায় বসবাস করা মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ
মাছ ধরে পাওয়া টাকায় সংসার চলে কি না—এমন প্রশ্নে জাহানুর বিবির চোখে বিষাদ ঘনিয়ে আসে। চুপ করে কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, “না...আরও দেনা থাকে। দোকানের দেনা, দাদনের দেনা...”
নদীতে ঝড় উঠলে নৌকা নিয়ে খালে আশ্রয় নেন তারা। কখনো হঠাৎ ঝড় ওঠে, তখন ফেরার উপায় থাকে না। তটস্থ হয়ে নৌকা তীরে ভিড়িয়ে ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা করেন।
মানতা সম্প্রদায়ের নৌকায় শিশুরা অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় বড় হয়। যাদের সাঁতার শেখা হয়নি, তাদের পা ২৪ ঘণ্টা নৌকার সঙ্গে দড়িতে বাঁধা থাকে। না হলে হামাগুড়ি দিয়ে বা অন্য কারণে পড়ে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু। গভীর জলে লাশও পাওয়া যায় না। অনেক আগে জাহানুর বিবির এক ছেলে এভাবে মেঘনায় তলিয়ে গিয়েছিল।
এখন মানতাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তারা ভোটও দেন। কিন্তু সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোনো সুবিধা পান না। জেলে কার্ড নেই, তাই সরকারি বরাদ্দের আওতায় পড়েন না।
জাহানুর বিবির সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে ছিলেন তাঁর স্বামী মো. ইব্রাহিম। তিনি বয়স একবার ৫০ বললেন, আবার ৫৫। তাঁরও জন্ম এমন একটি নৌকায়। দীর্ঘ জলযাযাবর জীবন কাটিয়ে এখন তিনি ক্লান্ত। মাটির ঘর চান, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মতো কোনো আশ্রয় পেলেই চলবে। তিনি বললেন, “ঝড়ের মধ্যে স্ত্রী, বাচ্চাকাইচ্চা নিয়া মরি, না বাঁচি, আল্লায় রাখবে, না লইয়া যাইবে—এর ঠিক থাকে না। একখান ঘর হইলে খুব সুবিধা হয়।”






