বাবার কোলে একটি যমজ সন্তানের মৃতদেহ, পুরো শরীর কাপড়ে মোড়ানো। মায়ের কোলে আরেকজন, জীবিত কিন্তু হাম থেকে পুরোপুরি সেরেনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে বের হচ্ছিলেন ফরিদপুরের কামরুজ্জামান ও জান্নাতি বেগম। তাঁদের দেখে জিজ্ঞাসা করায় তারা জানান, যমজ সন্তান রাইসা ও রুমাইসা দুজনেই হামে আক্রান্ত হয়েছিল। রাইসাকে বাঁচানো যায়নি।

পাঁচ মাস বয়সী এই যমজ বোনদের জন্ম হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। জন্মের পর নানা জটিলতায় তারা ১৫ দিন নবজাতকদের বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে ছিল। গতকাল বুধবার সকালে হামে আক্রান্ত হয়ে আবার এই হাসপাতালে আসে তারা বাবা-মায়ের কোলে।

কামরুজ্জামান বললেন, সকালে ফরিদপুর সদর হাসপাতাল থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে তারা ঢাকা মেডিকেলে আসেন। বেলা ১১টার দিকে রাইসা মারা যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে বের হচ্ছিলেন এই মা-বাবা। তাঁদের দেখে জানতে চাইলাম কী হয়েছিল। তাঁরা জানালেন, তাঁদের যমজ সন্তান রাইসা ও রুমাইসা। দুজনই হামে আক্রান্ত হয়েছিল। রাইসাকে বাঁচানো যায়নি।

হাসপাতালের মৃত্যুসনদে রাইসার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম-পরবর্তী জটিলতা ও হাম উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে মৃতদেহ নেওয়ার জন্য আরেকটি কাগজে লেখা হয়েছে, এটি কোনো ‘পুলিশ কেস’ নয়, হাম-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে।

পরিবার জানায়, ৯ দিন আগে রাইসা ও রুমাইসাকে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হামসহ নানা জটিলতায়। কামরুজ্জামান বললেন, ৯ দিন ধরেই দুই মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন। রুমাইসার অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও রাইসার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সদর হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (পিআইসিইউ) নেই। সেখানকার চিকিৎসকেরা তিন দিন আগেই পিআইসিইউ-সম্পন্ন হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কামরুজ্জামান সংক্ষেপে শুধু বললেন, ৯ দিন ধরেই দুই মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন। রুমাইসার অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও রাইসার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সদর হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (পিআইসিইউ) নেই। সেখানকার চিকিৎসকেরা আরও তিন দিন আগেই পিআইসিইউ আছে, এমন হাসপাতালে নিতে বলেছিলেন।

জান্নাতি বেগম বলেন, টাকার অভাবে তারা আগে আসতে পারেননি। টাকা জোগাড় করার পর মেয়েটি মারা যায়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০২০’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বছরে ব্যয় যদি ১০০ টাকা হয়, সরকার খরচ করে ২৩ টাকা এবং ব্যক্তি নিজে খরচ করে ৬৯ টাকা। ব্যক্তির এই খরচ বাড়ছে, যা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা খাতে ব্যক্তির ব্যয় বৃদ্ধির হিসাব জানিয়েছিল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০২০’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে। এতে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতে বছরে ব্যয় যদি হয় ১০০ টাকা, সরকার খরচ করে ২৩ টাকা। আর ব্যক্তি নিজে খরচ করে ৬৯ টাকা।

কামরুজ্জামান জানান, জন্মের পর ১৫ দিন হাসপাতালে থাকায় কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এবার হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে শুধু টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি বললেন, প্রতি পদে খরচ। বাড়ি ফেরার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৫ হাজার টাকার বেশি লাগবে। তিনি টুকটাক কাজ করেন।

অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার সময় জান্নাতি বেগম রাইসার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে মেয়ের মুখ-মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, তারপর ঢেকে সরে যান। কামরুজ্জামান মৃতদেহ যত্ন করে শুইয়ে দেন। মা মৃতদেহের পাশে বসতে চাইলে স্বজনরা রুমাইসার পাশে বসান। অ্যাম্বুলেন্স চলে যায়।

অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের লম্বা সিটে কামরুজ্জামান মেয়ের ছোট মরদেহটা খুব যত্ন করে শুইয়ে দেন। মা জান্নাতি বেগম মেয়ের মরদেহের পাশে বসার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকেন। স্বজনেরা এই মাকে সেখানে বসতে দিলেন না, সামনে দাদির কোলে থাকা রুমাইসার পাশে নিয়ে বসালেন। অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে গেল।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৪৩২ জন শিশু মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামে মৃত্যু ও সংক্রমণের তথ্য প্রকাশ করছে।

ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান গতরাতে বলেন, পিআইসিইউ শয্যা এই হাসপাতালের রোগীদের জন্যই যথেষ্ট নয়। বাইরের রোগীদের শয্যা দেওয়া কঠিন, তাই অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। হাসপাতালে পিআইসিইউ শয্যা ১৭টি।

পিআইসিইউ যে শয্যা আছে, তা এই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্যই যথেষ্ট নয়। বাইরে থেকে আসা রোগীদের শয্যা দেওয়া কঠিন। তাই অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান

আরও যমজ শিশুর মৃত্যু

হামে আরও একজোড়া যমজের একজন মারা গেছে। গত ২৭ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাসান নামের শিশু মৃত্যুবরণ করে। তার যমজ ভাই হোসেন বেঁচে গেছে। জন্মের সময়ই মা সুমাইয়া মারা যান। হাসান-হোসেন ফুফু ও নানির কাছে বেড়ে উঠছিল।

৫ মে মুক্তকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত মাস বয়সী যমজ বোন খাদিজা ও ফাতেমার মধ্যে ফাতেমা গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে মারা যায়। খাদিজা বেঁচে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ নয়।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রীবাস পাল বলেন, যমজদের মধ্যে একজন হামে আক্রান্ত হলে অন্যজনকে দূরে রাখা যায় না। একসঙ্গে থাকায় দুজনেই আক্রান্ত হয়। এই পরিবারের ভোগান্তি বেশি হয়। যমজ সন্তানের মায়ের পারিবারিক সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন, কারণ একজনের পক্ষে দুজনকে সামলানো কঠিন।

কামরুজ্জামানের কথা মনে পড়ে, সদর হাসপাতালে পিআইসিইউ নেই, ঢাকা মেডিকেলেও শয্যা খালি নেই। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য বাবা-মা যাবেন কোথায়?