চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে স্বনির্ভরতার অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের গল্পই নয়, এতে নতুন ধনকুবেরও জন্ম নিচ্ছে। এই অভিযানে সাম্প্রতিক সফলতার মধ্যে উহানভিত্তিক হুবেই ডিংলং কোম্পানি অন্যতম।
ডিংলং চিপ তৈরি করে না, বরং চিপ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপকরণ সরবরাহ করে। এই ক্ষেত্রেই তারা বাজি জিতেছে। কোম্পানির শেয়ারের দাম গত এক বছরে প্রায় ১১৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাই ঝু শুয়াংচুয়ান ও ঝু শুনচুয়ান শতকোটিপতিদের লাইনে যোগ দিয়েছেন।
শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ডিংলংয়ের চেয়ারম্যান ৬১ বছর বয়সী শুয়াংচুয়ান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ৫৭ বছর বয়সী শুনচুয়ান। দুজনের প্রত্যেকের কোম্পানিতে প্রায় ১৫ শতাংশ করে মালিকানা রয়েছে। ফোর্বসের হিসাবে, তাঁদের প্রত্যেকের সম্পদ এখন প্রায় ১৩০ কোটি ডলার।
এই উত্থান শুধু শেয়ারবাজারের ফল নয়, এর পেছনে চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি কৌশল কাজ করছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনের চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর দেশটি সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে আরও ত্বরান্বিত হয়। এর সুবিধা পেয়েছে ডিংলং-এর মতো কোম্পানি।
চিপ তৈরির মূল ধাপগুলোর একটি হলো কেমিক্যাল মেকানিক্যাল পলিশিং বা সিএমপি। এতে সিলিকন ওয়েফারের পৃষ্ঠ অত্যন্ত মসৃণ ও সমতল করা হয়, যাতে তার ওপর ক্ষুদ্র সার্কিট ছাপানো যায়। ডিংলং সিএমপি-সংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের উপকরণ তৈরি করে। এর মধ্যে ‘স্লারি’ নামক আধা-তরল রাসায়নিক রয়েছে, যা ওয়েফার সমতল করতে ব্যবহৃত হয়। প্রক্রিয়া শেষে পরিষ্কারকরণের তরলও তারা সরবরাহ করে। কোম্পানির দাবি, চীনে এমন সক্ষমতা আর কারও নেই।
ডিংলং এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির উপকরণও তৈরি করছে। লিথোগ্রাফিতে অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে সিলিকন ওয়েফারে সার্কিটের নকশা ছাপানো হয়। এই ক্ষেত্রে চীনের এখনো দুর্বলতা রয়েছে। ডিংলং ‘ফটোরেজিস্ট’ নামক বিশেষ রাসায়নিক তৈরি করছে, যদিও তাদের উন্নত পণ্য এখনো কম ক্ষমতার চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া কোম্পানি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং উপকরণে মনোনিবেশ করছে। যেমন বিশেষ আঠা, যা সিলিকন ওয়েফারকে কাচের ব্লকের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে যুক্ত রাখে। এতে ওয়েফার মানুষের চুলের চেয়ে পাতলা হয়, যা স্তরে স্তরে সাজিয়ে উচ্চক্ষমতার মেমরি চিপ তৈরিতে সাহায্য করে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ডিংলংয়ের নিট মুনাফা ৭৮ শতাংশ এবং রাজস্ব ২৪ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানির মতে, সিএমপি উপকরণ ব্যবসাই এর মূল চালিকাশক্তি। লিথোগ্রাফি ও উন্নত প্যাকেজিং ব্যবসা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে।
দুই ভাইয়ের সাফল্যের গল্পও উল্লেখযোগ্য। ডিংলং শুরু হয়েছিল ভিন্ন খাতে। দুই ভাই আগে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ২০০০ সালে তারা প্রিন্টার টোনারের রাসায়নিক তৈরির জন্য ডিংলং প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এই বাজার জাপানি ও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ধীরে ধীরে তারা চীনের রঙিন প্রিন্টিং শিল্পে বড় সরবরাহকারী হয়ে ওঠেন।
২০১০ সালে কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১২ সালে তারা সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ খাতে প্রবেশ করে। শুনচুয়ানের মতে, টোনার রাসায়নিক ও সিএমপি উপকরণের মিল খুঁজে পাওয়ার পরই এই পথে নামেন।
২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে শুয়াংচুয়ান বলেছিলেন, তাঁরা যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন চীনের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে পুঁজি বা বড় অবকাঠামো ছিল না। ছিল শুধু ধারণা, কিছু উদ্যম এবং ‘পেছনে ফেরার পথ বন্ধ করে দেওয়ার’ মানসিকতা। তাঁর ভাষায়, ‘ডিংলং কখনোই এই উদ্যম হারাবে না। জয় করার জন্য আরও বড় বিশ্ব অপেক্ষা করছে।’






