মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নগুলো প্রায়ই মাসিক আয়ের সীমায় আটকে থাকে। ভালো একটা ল্যাপটপ, বড় টিভি বা গরমে স্বস্তির জন্য এসি—প্রয়োজন হলেও একবারে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা অনেকের পক্ষে কঠিন। সঞ্চয় করে টাকা জমানোর সময় অনেকক্ষেত্রে দাম বেড়ে যায় বা প্রয়োজনটাই শেষ হয়ে যায়। এই সমস্যার সমাধান এনেছে ক্রেডিট কার্ডের ‘শূন্য শতাংশ (০%) ইএমআই’ সুবিধা।

শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনে এখন বাড়ির জরুরি জিনিসপত্র, কাঙ্ক্ষিত গৃহস্থালি সামগ্রী বা শখের স্মার্টফোন সবই অর্জনযোগ্য। এর পেছনে ক্রেডিট কার্ডের ‘০% ইএমআই’ বা সুদবিহীন কিস্তির ভূমিকা মুখ্য। এতে এককালীন বড় খরচের চাপ কমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে স্বস্তি। তবে এই সুবিধাকে টেকসই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ক্রেডিট কার্ড নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।

নতুন নীতিমালা: গ্রাহকের সুরক্ষা যখন প্রাধান্য

কার্ড লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং গ্রাহকরা অজান্তে ঋণের ফাঁদে না পড়েন, সেই উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নির্দেশনা জারি করেছে।

লুকানো খরচ নিষিদ্ধ: আগে অনেক ব্যাংক শূন্য শতাংশ ইএমআইয়ের নামে ‘প্রসেসিং ফি’ বা ‘অ্যাডমিন ফি’ কেটে নিত, যা মূলত সুদের মতোই ছিল। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে লেনদেনের আগেই সব চার্জ স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। লুকানো চার্জ আরোপ এখন দণ্ডনীয়।

সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার সাধারণ ঋণের সর্বোচ্চ হারের চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকের জন্য এটি ২০ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ। কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে চক্রবৃদ্ধি হারে জরিমানা বা অতিরিক্ত সুদ যোগ করা যাবে না।

বিলে স্বচ্ছতা: নতুন নিয়মে ন্যূনতম বকেয়া পরিশোধ করলে ব্যাংক শুধু অবশিষ্ট বকেয়ার ওপর সুদ ধরতে পারবে, সম্পূর্ণ বিলের ওপর নয়। এটি ইএমআই ব্যবহারকারীদের জন্য বড় স্বস্তি।

আন্তর্জাতিক লেনদেন: ভ্রমণ কোটার অধীন ডলার লেনদেনে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। পাসপোর্ট এনডোর্স ছাড়া আন্তর্জাতিক লেনদেন এখন দণ্ডনীয়। ই-কমার্সে আন্তর্জাতিক কেনাকাটার একক লেনদেনের সীমাও পুনর্নির্ধারিত।

পকেটের ওপর চাপ যখন সহনীয়

ইএমআইয়ের মূল আকর্ষণ হলো খরচের বিভাজন। শূন্য শতাংশে এলে পণ্যের মূলদাম ছাড়া কোনো সুদ দিতে হয় না। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড, ফার্নিচার শোরুম, হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৩৬ মাসের এই সুবিধা পাওয়া যায়।

উদাহরণস্বরূপ, একজন চাকরিজীবী ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ল্যাপটপ ১২ মাসের শূন্য শতাংশ ইএমআইয়ে কিনলে প্রতি মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিতে পারেন। এতে নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা মধ্যবিত্তের জন্য বড় সুবিধা।

দেশে সুবিধা মিলছে যেসব খাতে 

বাংলাদেশে শূন্য শতাংশ ইএমআই শুধু ইলেকট্রনিকসে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত খাতগুলো:

ইলেকট্রনিকস ও গ্যাজেট: মুঠোফোন, ল্যাপটপ, টিভি ও এসি কেনাকাটায় প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই শূন্য শতাংশ ইএমআই দিচ্ছে।

আসবাব ও গৃহসজ্জা: দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্নিচার ব্র্যান্ডগুলো ইএমআইয়ে কিস্তিতে ঘর সাজানোর সুযোগ দিচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা: বড় বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশন বা বড় চিকিৎসা বিল শূন্য শতাংশ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য।

ভ্রমণ ও পর্যটন: এয়ারলাইনস টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে এই সুবিধা জনপ্রিয়।

ই-কমার্স ও এয়ারলাইনস: কো-ব্র্যান্ডেড কার্ডে ই-কমার্স কেনাকাটায় শূন্য শতাংশ ইএমআইয়ের সঙ্গে ক্যাশব্যাক এবং এয়ারলাইনস কার্ডে ফ্রি লাউঞ্জ সুবিধা পাওয়া যায়। এটি খরচকে বিনিয়োগে রূপান্তরিত করে।

সম্ভাবনা: আরও যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে

বিদেশের তুলনায় বাংলাদেশে ইএমআই এখনো সীমিত। এটি প্রসারিত হতে পারে:

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি বা কোর্স ফি কিস্তিতে দিলে উচ্চশিক্ষা সহজ হবে।

বিমা প্রিমিয়াম: জীবনবিমা বা স্বাস্থ্যবিমার বার্ষিক প্রিমিয়াম কিস্তিতে দেওয়া গেলে আগ্রহ বাড়বে।

কৃষি যন্ত্রপাতি: প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ট্রাক্টর বা সেচপাম্প কিস্তিতে কেনার ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব আনবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বনাম দেশ

উন্নত দেশগুলোতে ‘বাই নাউ, পে লেটার’ বা শূন্য শতাংশ ইএমআই আমাদের চেয়ে বিস্তৃত।

উন্নত বিশ্ব: আমেরিকা বা ইউরোপে অ্যামাজন বা ওয়ালমার্ট ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই থার্ড পার্টি অ্যাপে শূন্য শতাংশ ইএমআই দেয়। ক্রেডিট স্কোরে শিক্ষার্থীরাও লোন পায়।

বাংলাদেশ: এখানে এটি ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ডিজিটাল ব্যাংকিং নীতিমালা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যতে এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার পথ খুলে দিচ্ছে।