সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়া অন্যের জমির ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে একদল লোক। স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন। হাওরের গভীর অংশে পানি থইথই করায় অনেক জায়গায় জমির সীমানাও চেনা যাচ্ছে না।
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে গত সোমবার ও মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসীরা পুলিশকে খবর দিলে গতকাল দুপুরে পুলিশ হাওরে হাজির হয়। পুলিশ দেখা পেয়ে ধান কাটায় জড়িত লোকেরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ সকলকে সতর্ক করে বলে, নিজের জমি ছাড়া অন্যের ধান কাটতে নেই।
‘ধানের লগে ক্ষীরা-মরিচও নষ্ট অইছে, আমি একবারে শেষ’।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, দিরাই উপজেলার বড় ধানের হাওরগুলোর একটি বরাম হাওর। এর কিছু অংশ শাল্লা উপজেলাতেও পড়েছে। সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হাওরের দিরাই উপজেলার ভাঙাডহর ও ডাইয়ারগাঁও অংশের অনেক জমির ধান তলিয়ে যায়। তখন মানুষ উঁচু অংশের ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে ব্যস্ত ছিল, নিচু অংশের ধান কাটতে পারেনি।
স্থানীয় দুজন কৃষক বলেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান তোলা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও শ্রমসাধ্য কাজ। এ জন্য নৌকা ও অতিরিক্ত শ্রমিক লাগে। কোথাও কোথাও ডুব দিয়ে ধান কেটে তুলতে হয়। অনেক কৃষক তাই তলিয়ে যাওয়া ধান আর কাটেন না। আবার কেউ কেউ চেষ্টা করেন। স্থানীয় ভাষায় ডুবে যাওয়া ধান কেটে তোলাকে বলা হয় ‘আকি দেওয়া’।
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান তোলা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও শ্রমসাধ্য কাজ। এ জন্য নৌকা ও অতিরিক্ত শ্রমিক লাগে। কোথাও কোথাও ডুব দিয়ে ধান কেটে তুলতে হয়। অনেক কৃষক তাই তলিয়ে যাওয়া ধান আর কাটেন না। আবার কেউ কেউ চেষ্টা করেন।
হাওরের পানি কিছুটা কমতে শুরু করায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোক দুই দিন ধরে নৌকা নিয়ে হাওরে গিয়ে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন। স্থানীয়দের মতে, ১০ থেকে ১৫টি নৌকায় করে তারা পানির নিচের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা বাধা দিলেও তারা না মানায় পুলিশকে জানানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছু লোক পালিয়ে যান। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁরা নিজেদের জমির ধান কাটছিলেন। তবে পানিতে জমির সীমানা ডুবে যাওয়ায় কোন জমি কার, সেটি চেনা এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাওরে অন্যের জমির ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে, যেন নিজেদের জমির ধানই কাটেন, কোনোভাবেই অন্যের জমিতে না যান। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের জমির ধান কেটে নেওয়ার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছু লোক পালিয়ে যান। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁরা নিজেদের জমির ধান কাটছিলেন। তবে পানিতে জমির সীমানা ডুবে যাওয়ায় কোন জমি কার, সেটি চেনা এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জ জেলার ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরের নিচু অংশে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে এবং উঁচু বা নন-হাওর এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টরে।
সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। পরে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এখন আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় কৃষকেরা ধান কাটা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জে গড়ে ৮৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। মোট কাটা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৭ হেক্টর জমির ধান। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮২ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৪১ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সেই হিসাবে এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ ধান কাটা বাকি আছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও কৃষকবান্ধব সংগঠনের লোকজন বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখনো চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা হয়নি। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।






