সম্প্রতি শাস্ত্রীয় নৃত্যের আয়োজন কম দেখা যায়। তাই সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে সৃষ্ট আবহ ছিল ব্যতিক্রমী। সাংস্কৃতিক সংগঠন ভৈরবীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় শাস্ত্রীয় নৃত্য উৎসব ‘ধ্রুপদ’।

সন্ধ্যা গড়ানোর আগেই মিলনায়তন দর্শকদের ভিড়ে পূর্ণ। অনেকে পুরো অনুষ্ঠান দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন। এই আয়োজন যেন প্রমাণ করে দিল—পরিপাটি, আন্তরিক ও নন্দনসমৃদ্ধ উপস্থাপনায় শাস্ত্রীয় নৃত্যের দর্শক এখনও অটুট।

সন্ধ্যা সাতটায় অনুষ্ঠান শুরুর কথা থাকলেও তার অনেক আগে স্টুডিও থিয়েটারের সামনে দর্শকদের দীর্ঘ সারি লাগে। আসন পূর্ণ হওয়ার পরও উৎসাহী ভিড় কমে না। আয়োজকদের মতে, এমন দর্শকসমাগম তাদের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। ছোট পরিসরের এই থিয়েটার যেন বড় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

ধ্রুপদের প্রধান শক্তি ছিল এর বৈচিত্র্য। একই মঞ্চে ভরতনাট্যম, মণিপুরি, কত্থক, ওডিশা ও কথাকলির মতো পাঁচটি ভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা উপস্থাপিত হয়। ফলে অনুষ্ঠান শুধু পরিবেশনার সমষ্টি হয়নি; ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় নৃত্যঐতিহ্যের এক মনোমুগ্ধকর যাত্রায় রূপ নেয়। ছন্দ, মুদ্রা, অভিব্যক্তি, আধ্যাত্মিকতা ও গল্পকথনের মিশ্রণে আয়োজনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সম্মোহনী আবহ।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও স্বাগত বক্তব্য দেন ভৈরবীর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইলিয়াস নবী ফয়সাল। তিনি বলেন, “শাস্ত্রীয় নৃত্য কেবল একটি শিল্পমাধ্যম নয়; এটি মানুষের ভাব, দর্শন, শরীরী ভাষা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।” তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মকে শাস্ত্রীয় নৃত্যের গভীরতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং শিল্পী, দর্শক ও গবেষকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তোলাই ধ্রুপদর উদ্দেশ্য।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৃত্যশিল্পী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোমা মুমতাজ, ট্যাগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ আর্টসের রিসোর্স পারসন ও কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়ের পরিচালক সাজু আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন তামান্না রহমান। বক্তব্যে তামান্না রহমান বলেন, “আমি জানি না ফয়সাল কীভাবে একা এত বড় একটি আয়োজন করেছে। এত সুন্দর ও সুসংগঠিত আয়োজন দেখে আমি মুগ্ধ। আমি চাই, ভবিষ্যতেও প্রতিবছর এই আয়োজন হোক।”

উৎসব শুরুতেই মঞ্চে উঠে আসে মণিপুরি নৃত্যের ‘পুং চোলম’। শিল্পী অর্ণব শর্মা পুংবাদন, ঘূর্ণন ও দেহভঙ্গির সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। থিংগম ব্রোজেন কুমার সিংহের নৃত্য রচনায় লাইভ মিউজিকের সঙ্গে এটি আরও প্রাণবন্ত হয়।

তারপর ভরতনাট্যম দল পরিবেশন করে ‘তোড়িয়াম’। আসমাউল হুসনা মাশিয়াত, প্রত্যাশা বসাক, অরিত্রী রহমান বর্ষা ও সুবহা বিনতে সোবহানের যৌথ উপস্থাপনা ছিল সন্ধ্যার পরিশীলিত প্রদর্শনীগুলোর একটি। থাঙ্কুমুনি কুট্টির নির্মাণ ও প্রিয়াংকা সরকারের পুনর্নির্মাণে রাগমল্লিকা ও আদি তালের মিশ্রণে এটি অনুষ্ঠানকে গম্ভীর ও নান্দনিক সূচনা দেয়।

কত্থক নৃত্যে দল প্রজন্ম পরিবেশন করে ‘বন্ধিশ-আয়ো শাবান’ ও ‘রবি শঙ্কর তারানা’। নিশিগন্ধা দাশ গুপ্তা, হাফসা আলম স্নাতা, যোহানা সূচনা দাস ও আবু ইবনে রাফির প্রাণবন্ত পদচারণ ও ছন্দময় ভঙ্গি দর্শকদের আকৃষ্ট করে। নৃত্য নির্মাণ করেন মোহাম্মদ হানিফ।

এরপর নিবেদিতা দাসের ‘বসন্ত তিল্লানা’ দ্রুত লয় ও শুদ্ধ ভঙ্গির দারুণ উপস্থাপনা। গুরু খগেন্দ্র নাথ বর্মনের রচনায় তিনি বসন্তের উচ্ছ্বাস মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এর শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘মাইবি জাগোই’। নিংথৌজম মিথিলা চনু, নাউশেকপম জয়িতা সিনহা ও লুকরাম রশনী সিনহার কোমল প্রতীকী ভঙ্গিমায় মণিপুরি আধ্যাত্মিকতা উঠে আসে। পেনা বাজান নিংথৌজম শুভদীপ সিংহ, ধুলবে লুকরাম আদি সিংহ। ওডিশা নৃত্যে তজিম চাকমার ‘বসন্ত পল্লবী’ রাগ বসন্ত ও একতালির অপূর্ব মেলবন্ধন। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের পরিকল্পনায় এটি প্রশংসা পায়।

কত্থক শিল্পী মন্দিরা চৌধুরী পরিবেশন করেন ‘শিবস্তুতি’ ও শুদ্ধ নৃত্য। ত্রিতাল ও ধামার তালভিত্তিক এতে শিবতত্ত্বের গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। নৃত্য নির্মাণ ড. সুচরিতা দত্ত ঘাটা। প্রান্তিক দেব পরিবেশন করেন ভরতনাট্যমের ‘অম্বা স্তুতি’। রাজরাজেশ্বরী দেবীর বন্দনাভিত্তিক এতে ভক্তি, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতা মিলিত হয়।

মণিপুরি নৃত্যে মিথিলা চনুর ‘ব্রহ্মতাল প্রবন্ধ’ শক্তিশালী ভঙ্গি ও তীব্র লয়ে আকর্ষণীয়। গুরু বিপিন সিংহের রচনায় শ্রীকৃষ্ণের তাণ্ডব দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানের আকর্ষণ কথাকলি শিল্পী রোমন ইসলাম প্রীতমের ‘দুর্যোধন বধ’। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও শ্রীকৃষ্ণের রৌদ্ররসকেন্দ্রিক এতে অভিনয়ভঙ্গি ও রসের গভীরতা বিমোহিত করে। মুখাভিনয়, চোখের ভাষা ও নাটকীয় ভঙ্গি দর্শকদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। নৃত্য নির্মাণ গুরু কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট।

এরপর ভরতনাট্যমে মারিয়া ফারিহ উপামার শুদ্ধ ভঙ্গি, সুষম দেহরেখা ও নান্দনিক অভিব্যক্তি। কত্থকে সোনিয়া পারভীনের ‘তারানা’ দ্রুত পদচারণ ও ছন্দে ভরপুর। রাগ বাসন্ত ও ত্রিতালভিত্তিক, নির্মাণ মনিরা পারভীন। অপর্না নিশির ‘রাধা রূপ বর্ণন’-এ শ্রীরাধার সৌন্দর্য ও শৃঙ্গাররস সুকুমারভাবে ফুটে ওঠে। গুরু কলাবতী দেবীর রচনায় এটি লাস্যময়।

ওডিশায় মো. জসিম উদ্দীনের ‘বসন্ত পল্লবী’ এবং শেষে প্রিয়াংকা সরকারের ‘পুষ্পাঞ্জলি’ ও ‘কীর্তনাম’ সমাপ্তির পরিণতি দেয়। ভক্তি, অভিনয় ও জটিল পদচারণে ধ্যানমগ্ন আবহ তৈরি হয়। নৃত্যম নৃত্যশীলন কেন্দ্র পরিবেশন করে মণিপুরি ‘রাধা অভিসার’। গুরু বিপিন সিংহের রচনা ও তামান্না রহমানের পরিচালনায় ফারহানা করিন তন্দ্রা ও প্রমা বিশ্বাস অংশ নেন। শ্রীরাধার প্রেম ও অভিসার নান্দনিকভাবে উঠে আসে।

নাট্যচর্চায় পরিচিত ভৈরবীর জন্য ধ্রুপদ নতুন শিল্পযাত্রার সূচনা। এটি সংগঠনের সাংস্কৃতিক ভাবনার বিস্তার ঘটায়। পুরো অনুষ্ঠানে অন্তরঙ্গ, পরিশীলিত ও শিকড়নির্ভর আবহ অনুভূত হয়। সব মিলিয়ে ধ্রুপদ শুধু নৃত্য উৎসব নয়, শাস্ত্রীয় শিল্পের প্রতি দর্শকের আগ্রহের উজ্জ্বল উদাহরণ। টিকটক-রিলসের যুগেও এমন পরিশীলিত শিল্প দর্শক স্পর্শ করে, এ কথা আয়োজন মনে করিয়ে দেয়।