সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকার গঙ্গা/পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের ‘প্রাথমিক প্রস্তাবনা’ (পিডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট মহলের পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আগ্রহ সবাই জানেন। এ কারণেই আগের সরকারের আমলে প্রণীত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’-এ এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বর্তমান পিডিপিপিতে এর বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এত বিশাল বাজেটের প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক; তবে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রকল্প বাংলাদেশের উপকারে আসবে কি না—এটা কি প্রকল্প প্রস্তুতকারীরা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন? এমন কোনো সমীক্ষা আছে কি? থাকলে সেগুলো জনগণের সামনে কেন তুলে ধরা হচ্ছে না?
পাউবোর প্রণীত পিডিপিপিতে এই প্রকল্পের পক্ষে একটি যুক্তি উল্লেখ আছে—শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিমের নদ-নদীতে প্রবাহিত করা যাবে। কিন্তু সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবগুলোর কোনো আলোচনা বা উল্লেখ এতে নেই। অথচ এই প্রকল্প উজানী এলাকা এবং ভাটির উভয় অঞ্চলেই মারাত্মক ক্ষতি করবে।
প্রথমত, ব্যারাজের উজানে পলি জমে তলদেশ উঁচু হয়ে যাবে এবং পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা ও পাড়ভাঙন বাড়বে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাই এর প্রমাণ। ফারাক্কার ফলে উজানে বিহারের পাটনা পর্যন্ত গঙ্গার তলদেশ প্রায় ২০ ফুট উঁচু হয়েছে, ফলে বন্যা ও পাড়ভাঙন তীব্রতর হয়েছে। এ কারণেই বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ফারাক্কা বাঁধ ভাঙার দাবিতে সেখানে প্রবল আন্দোলন হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ, খরচ ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা।
দ্বিতীয়ত, ব্যারাজ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে শুষ্ক মৌসুমের পানি অপসারণের ফলে দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনায় ঠিক ততটুকু পানি কমবে। ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ হ্রাস পাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্তা দেশের আরও গভীরে প্রবেশ করবে।
তৃতীয়ত, এই প্রকল্পের কারণে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের সুযোগ আর থাকবে না। ভারত বলবে, পদ্মা ব্যারাজ দক্ষিণ-পশ্চিমের সমস্যা সমাধান করেছে। তাই ভারত এ প্রকল্পে উৎসাহী, এ আশ্চর্যের কিছু নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে করার চিন্তাও হয়েছিল।
এই সব বিষয় বিবেচনা করে পরিবেশবাদী সংগঠন বাপা ও বেন মনে করছে, অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে এগোনো হঠকারিতা হবে। তারা বলছে, সরকারের উচিত—প্রথমত, জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদ-নদী ব্যবহার চুক্তি স্বাক্ষর ও র্যাটিফাই করে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের হিস্যা বাড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা এবং আসন্ন গঙ্গা চুক্তি নবায়নে এ দাবি তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, গঙ্গার সঙ্গে অভ্যন্তরের সব শাখানদীতে সংযোগ অবারিত করা এবং সেগুলোর উপর নির্মিত সব প্রবাহবিঘ্নকারী প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা। তাহলে বর্ষাকালীন গঙ্গার প্রবাহ এসব নদীতে প্রবাহিত হবে।
সাম্প্রতিক বড়াল নদের অভিজ্ঞতাই এর প্রমাণ। রাজশাহীর চারঘাটে ১৯৮৪ সালে পাউবোর নির্মিত স্লুইসগেট গঙ্গার প্রবাহ বন্ধ করেছিল। বাপা ও বেনের আন্দোলনের ফলে গত বছর এটি আংশিক উন্মোচিত হলে প্রায় ৪০ বছর পর নদীতে গঙ্গার পানি ফিরে এসেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে পাউবোকে শিক্ষা নিতে হবে। আরেকটি ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রশ্নবিদ্ধ কাঠামোর পেছনে না ছুটে আগের ক্ষতিকর কাঠামোগুলো সরানো দরকার। তাহলে নদীব্যবস্থা আরও উপকারী হবে। সুতরাং একদিকে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং অন্যদিকে প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বর্ষাকালীন প্রবাহের সঠিক ব্যবহার—এই দুই পথে এগোনো উচিত।
বস্তুনিষ্ঠ সমীক্ষা ছাড়া প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে অগ্রসর হওয়া নবগঠিত বিএনপি সরকারের জন্য সঠিক হবে না।
নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান






