সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল, লবণাক্ত জলের ঢেউ এবং গোলপাতার ঝোপে প্রকৃতির আদিম রূপ লুকিয়ে আছে। এখানে মানুষের পায়ের ছাপ সীমিত, আর প্রযুক্তির ছোঁয়া একসময় ছিল অকল্পনীয়। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র বা রিসোর্টগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ছিল নিয়মিত সমস্যা। কিন্তু এখন সেই দিন শেষ। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক সুন্দরবনে যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন ভ্রমণকারী পর্যটকদের প্রধান অভিযোগ ছিল ধীরগতির ইন্টারনেট। বনের গভীরে মোবাইল টাওয়ার কম এবং ঘন বনের কারণে তরঙ্গ বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে থ্রি-জি বা ফোর-জি সেবা কার্যকর হয় না। স্টারলিংক এই সমস্যা সমাধান করেছে। কোনো টাওয়ার বা মাটির কেবল ছাড়াই সরাসরি উপগ্রহ থেকে সুন্দরবনে ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে।

সুন্দরবনের পাশে দাকোপের জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন জানান, ‘সুন্দরবন ঘেঁষে দুটি রিসোর্টে গত কয়েক মাস হলো স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট–সুবিধা নিয়েছি আমরা। আগে ইন্টারনেটের জন্য আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন আমরা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজ থেকে শুরু করে বুকিং ম্যানেজমেন্টের সব কাজ খুব সহজে করছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের অতিথিরা এখন বনের ভেতরে থেকেও বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছেন। আমরা কোনো কোনো সময় ১৫০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি পাচ্ছি। সুন্দরবনের মতো দুর্গম জায়গায় এটি ভাবাই যেত না।’

সুন্দরবন যুব সংঘের সদস্য মো. জুয়েল বলেন, এখন সুন্দরবনে অনেক তরুণ আসেন। তাঁরা বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত থাকেন। স্টারলিংকের ইন্টারনেটের কারণে তাঁদের বনের আশপাশে থাকার আগ্রহ বেশ বেড়েছে বলা যায়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ বা অফিসের টুকিটাকি কাজ, কিংবা ঢাকার সঙ্গে ই–মেইল যোগাযোগ কোনো বিষয়ই নয় এখন।

এখনকার পর্যটনের ধরন বদলে গেছে। ভ্রমণে গিয়ে কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে চান না অনেকে, বিশেষ করে ওয়ার্কেশনপ্রিয়রা। সুন্দরবনে স্টারলিংক তাদের জন্য বরदान। এক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আলিমূল হাসান সম্প্রতি পরিবারসহ তিন দিন সুন্দরবনে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়, কিন্তু এখানে মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট এতটাই দুর্বল যে জরুরি ই–মেইল চেক করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই রিসোর্টে এসে আমি অবাক হয়েছি। এখানে তরুণ কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে স্টারলিংক ব্যবহার করছেন। আমি রিসোর্টে বসেই গড়ে ৮০ থেকে ১২০ এমবিপিএস গতিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছি। ফলে বনের মধ্যে থেকেও অফিসের কাজ সারতে বা পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত থাকতে কোনো সমস্যাই হয়নি।’

সুন্দরবন প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে মোবাইল টাওয়ার ও বিদ্যুৎসংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয় এবং উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য গবেষক রুবিনা হক বলেন, স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এই সংকটে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এটি স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। শুধু একটি বহনযোগ্য রিসিভার এবং পাওয়ার ব্যাকআপ থাকলেই দুর্যোগেও বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব। সুন্দরবনের আশপাশের উপজেলায় নামমাত্র ব্রডব্যান্ড থাকলেও গতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে অসন্তোষ ছিল। স্টারলিংক সেই শূন্যতা পূরণ করে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিচ্ছে।

সুন্দরবনের প্রান্তিক এলাকায় এই ইন্টারনেট কেবল পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন শিক্ষা ও ই-কমার্সে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গবেষকরা স্টারলিংকের সাহায্যে তথ্য আদান-প্রদান করছেন। তবে উচ্চমূল্যের কারণে এটি এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। খরচ কমলে প্রত্যন্ত সুন্দরবনে আরও সুযোগ বাড়বে।