১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপের মহাযাত্রা শুরু হয়। আজ শতবর্ষের প্রাক্কালে এই ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে রোমাঞ্চকর স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ। এর মধ্যে পেলের সাম্বা ছন্দ, ম্যারাডোনার জাদুকরি ছোঁয়া, জিদান বা মেসির অমরত্বের গল্প সব মিলিয়ে ফুটবলের পুরাণ গড়ে উঠেছে।
এই ধারণা এসেছিল ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের মাথায়। ফিফার সদস্যদেশগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজনের চিন্তা তাঁরই। ১৯৩০ সালে এটি বাস্তবে রূপ নেয়। উরুগুয়েতে হয় প্রথম বিশ্বকাপ। সেই বছরই দেশটি সংবিধান প্রণয়নের শতবর্ষ পালন করছিল। এছাড়া ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিক ফুটবলে তারা সোনা জিতেছিল। তাই স্বাগতিক হিসেবে উরুগুয়েকে নির্বাচন করা হয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর যাতায়াত ও আবাসন খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
টুর্নামেন্টের মাত্র এক বছর আগে উরুগুয়েকে আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বাগতিকরা সময়ের সঙ্গে লড়াই করে। সব ম্যাচ একটি মাঠেই হয়। শ্রমিকরা আট ঘণ্টার শিফটে দিনরাত কাজ করে ‘এস্তাদিও সেন্তেনারিও’ তৈরি করেন। গ্যালারি টুর্নামেন্ট শুরুর পাঁচ দিন পর প্রস্তুত হয়। ১ লাখ দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচগুলোতে লোক ঢোকানো হয় খুব সতর্কতার সঙ্গে।
১৩টি দেশ অংশ নেয়—দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সাত, উত্তর আমেরিকা থেকে দুই, ইউরোপ থেকে চারটি। অন্য মহাদেশ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়া তখন সহজ ছিল না। গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া ছিল বিলাসিতা। ইতালি আয়োজক হতে চেয়েছিল কিন্তু না পেরে অংশ নেয়নি। রোমানিয়া রাজা দ্বিতীয় ক্যারোলের জোরাজুরিতে যায়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুগোস্লাভিয়া সঙ্গী হয়। ইউরোপীয় দলগুলো ‘কোন্তে ভার্দে’ বাষ্পচালিত জাহাজে তিন সপ্তাহ পাড়ি দিয়ে পৌঁছায়। ফিটনেস ধরে রাখতে জাহাজের ডেকে দৌড়াতেন খেলোয়াড়রা। মিসর দল ভূমধ্যসাগরে ঝড়ে কানেক্টিং জাহাজ মিস করে খেলতে পারেনি।
প্রথম দিন ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র মাঠে নামে। মেক্সিকোকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ফ্রান্সের লুসিঁয়ে লরাঁ প্রথম গোলদাতা হন। বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিম ডগলাস প্রথম ক্লিনশিট করেন। সেমিফাইনালে যায় আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া। দুই সেমিফাইনালেই লাতিন দলগুলো ৬-১ গোলে জয়ী হয়। উরুগুয়ে যুগোস্লাভিয়াকে, আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রকে হারায়। ফাইনালে হয় ‘স্প্যানিশ ভাষী’ দুই দেশের লড়াই—এখনও একমাত্র।
ফাইনালের আগেই মন্টেভিডিও উত্তপ্ত। আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের খুনের হুমকিতে পুলিশি পাহারায় রাখা হয়। রেফারি জন ল্যাঞ্জেনাস জীবনবিমা না করে মাঠে নামতে চাননি। ফাইনালের বল নিয়ে কলহ হয়। আর্জেন্টিনা তাদের বল চায়, উরুগুয়ে ইংল্যান্ডের বল। টসের ফলে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে, দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের। প্রথমার্ধে ২-১ এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে নিজেদের বলে ৩ গোল করে ৪-২ গোলে জয়ী হয়।
উরুগুয়ের হোসে নাসাজ্জি বিশ্বকাপ ইতিহাসে আলাদা। ‘দ্য গ্র্যান্ড মার্শাল’ নামে পরিচিত এই ডিফেন্ডার প্রথম অধিনায়ক। তাঁর ট্রফিসহ আনুষ্ঠানিক ছবি নেই। এক ছবিতে জুলে রিম ট্রফি দিচ্ছেন উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পল জুদের হাতে। পরদিন উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি পালিত হয়। বুয়েনস এয়ারেসে ক্ষুব্ধ আর্জেন্টিনা সমর্থকরা উরুগুয়ে দূতাবাসে হামলা চালায়।
প্রথম বিশ্বকাপের কোনো খেলোয়াড় এখন বেঁচে নেই। শেষ জীবিত ছিলেন আর্জেন্টিনার ফ্রান্সিসকো ভারালো। ২০১০ সালে ১০০ বছর বয়সে তিনি মারা যান।






