ভাঙাচোরা সড়ক, উত্তাল নৌপথ এবং এবড়োখেবড়ো ইটের পথ পেরিয়ে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চর টগবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছালাম যখন, তখন ঘড়িতে বেলা ১১টা। সব শ্রেণিকক্ষে শিশুরা যে যার মতো হইচই করছিল। মাত্র একটি কক্ষে একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে কিছু একটা পড়াচ্ছিলেন। পরে জানা গেল, এই বিদ্যালয়ের মাত্র দুজন শিক্ষকের একজন তিনি। অন্যজন অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। ফলে তিনি একাই ছয়টি শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন।

এই বিদ্যালয় দ্বীপ জেলা ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চরে অবস্থিত। নাম ‘৬৪ নং চর টগবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

গত রোববার সকাল নয়টার দিকে ভোলা শহর থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় রওনা দিয়ে তুলাতলী ঘাটে পৌঁছাই। সেখান থেকে আড়াই ঘণ্টা পরপর ট্রলার ছাড়ে। খালি চোখে ওপারের চর দেখা যায় না। আমাদের ট্রলার ছাড়ল ১০টায়। মেঘনার বুকে ৩০ মিনিটের যাত্রা। চরের ঘাটে নামার পর ভাড়া মোটরসাইকেলে চড়তে হলো। এই চরে কোনো পাকা সড়ক নেই। প্রধান সড়ক ইটের সোলিং করা। এবড়োখেবড়ো সড়কে রোলার কোস্টার রাইডের মতো অভিজ্ঞতা নিয়ে পৌঁছালাম বিদ্যালয়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুছা কালিমুল্যাহ আমাদের দেখে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে অফিসকক্ষে বসতে দিলেন। দুর্গম বিদ্যালয়ে হঠাৎ অতিথির আগমনে তাঁর চোখমুখে আনন্দের ছাপ। সিলিংয়ে ফ্যান আছে, কিন্তু গরমেও তা চলছে না। বললেন, চরে বিদ্যুৎ নেই। সোলার প্যানেল দিয়ে ফ্যান চলত, সেটি বছর তিনেক হলো অকেজো। বহু দেনদরবার করলেও কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দেয়নি।

মুছা কালিমুল্যাহ নিজেই বললেন, দুর্গম এই বিদ্যালয় নিয়ে তাঁর অসহায়ত্ব ও লড়াইয়ের কথা। বর্তমানে শিক্ষক দুজন। তিনি থাকেন বিদ্যালয় থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ভোলা শহরে, অন্যজন দৌলতখান উপজেলায়। একজন না আসলে অন্যজনকে ছয়টি ক্লাসের বাচ্চাদের সামলাতে হয়। ঝড়ঝঞ্ঝায় মেঘনা পার হতে না পারলে বাচ্চারা পড়ালেখা না করে বাড়ি ফিরে যায়।

শিক্ষক কালিমুল্ল্যাহ বলেন, ‘নদীতে ভাটা হলে প্রায়ই কোমরসমান পানিতে নেমে ট্রলারে উঠতে হয়। আবার ট্রলার ছাড়ার সময় মিস করলে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এখানে প্রতিদিন যাতায়াতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয়। এ কারণে শিক্ষকরা কিছুদিন পর তদবির করে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। কেউ বেশি দিন থাকতে চান না।’

কালিমুল্ল্যাহ বলেন, শিক্ষার্থী ২০০ জনের মতো, ক্লাসে আসে ১৫০-১৬০ জন। বেশিরভাগ জেলে ও অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। মাস দুয়েক আগে মিড-ডে মিল চালুর পর উপস্থিতি দ্বিগুণ হয়েছে। দপ্তরি, পিয়ন বা আয়া নেই। পরিচ্ছন্নতা শিক্ষার্থীরাই সামলায়।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী নূপুর আক্তার বলছিলেন, শিক্ষক কম থাকায় পড়ালেখায় অসুবিধা। একজন শিক্ষক এলে নিম্ন শ্রেণির শিশুরা চিৎকার শুরু করে, শিক্ষক ছুটে যান। ফলে তাদের পড়া ঠিকমতো হয় না।

শিক্ষকের স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতায় পড়ালেখার মান ভালো না বললেন প্রধান শিক্ষক মুছা কালিমুল্যাহ। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের কথা থেকেও তা বোঝা গেল।

বিদ্যালয়ের পাশে মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের ‘মদনপুর আলোর পাঠশালা’। সেখানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পড়ানো হয়। প্রধান শিক্ষক মো. আখতার হোসেন বলেন, চরের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান একই। প্রাথমিক পাস করে আসলে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি অ্যালফাবেট নতুন করে শেখাতে হয়। ফলে উচ্চ শ্রেণির পড়ায় জোর দেওয়া যায় না।

আখতার হোসেন বলেন, ‘এমন একটা পরিবেশে আমরা বাচ্চাদের পড়ালেখা করাই, মা–বাবা জানে না তার সন্তানেরা কোন ক্লাসে পড়ে। এ ছাড়া প্রাইমারি স্কুলগুলো সরকারি হওয়ায় শিক্ষকদের অবহেলা আছে। যারা আসেন, তাঁরা বদলি হয়ে যান। যাঁরা আছেন, তাঁরাও ঠিকমতো ক্লাস নেন না। ফলে পড়ালেখার মান খারাপ।’

আরও একটি সংকটের কথা বললেন আখতার হোসেন। চরের পরিবার মৎস্যজীবী ও কৃষক। ইলিশ, বাগদা চিংড়ি মৌসুমে ছাত্ররা মাছ ধরতে যায়। ধান-সয়াবিন মৌসুমে কাজ করে। এ সময় ক্লাসে আসে না, পড়ায় পিছিয়ে পড়ে।

পড়ালেখা না হওয়া ও দারিদ্র্যে ঝরে পড়া অনেক। মো. হৃদয় চর টগবী প্রাথমিকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাবার সঙ্গে মাছ ধরে।

পড়ালেখা ছেড়ে কেন—প্রশ্নে হৃদয় বলল, ‘ছাইড়া দিছি, বাপে পড়াইব না। এ ছাড়া স্কুলে পড়ালেখার চাপ নাই। পড়ায় না তেমন। আধা ঘণ্টা, হাইয়েস্ট এক ঘণ্টা পড়াই ছুটি দিত। স্যাররা কয়দিন স্কুলে আইলে, এরপর এক দিন দুই দিন আইতো না। আমরা স্কুলে আসি, আবার ফেরত যাইতাম। এসব কারণে বাপে আর রাখে নাই।’