প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের এক শক্তিশালী ভিত্তি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার চেতনা শুধু সাহিত্যিক উত্তরাধিকারই নয়, প্রবাসী বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের গভীর প্রেরণা।
এই চেতনাকে ধরে কাজ করে আসছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়া’। সংগঠনটি নজরুল সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিচ্ছে।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার বারব্যাংকে ‘নজরুল লিগ্যাসি’ নামে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তরঙ্গের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি শিপার চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে এবং আম্বারীন রহমান ও জায়িদ হকের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠান শুরু হয় শিশুশিল্পী শেহজীন রহমানের বাঁশিতে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশনের মাধ্যমে। এতে মিলনায়তনে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানজুড়ে শিশুদের অংশগ্রহণ ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। গান, কবিতা, নৃত্য ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে তারা আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে। শিশু সিম্পোজিয়াম উপস্থাপনা করেন এনজেলা আহসান। অংশ নেন মানহা রায়ান, মেহভেশ, মুনিশা ও আবরার মাহাদি।
সংগীত, কবিতা ও নৃত্য পরিবেশন করেন আলভিনা ইসলাম, টানি ইসলাম, অনিন্দিতা সাহা, মাহি ইসলাম, অনুপম সাহা, সুপর্ণা সাহা প্রমুখ। বিশেষ অতিথি ছিলেন নজরুল–গবেষক গুলশান আরা, আজফার ও কাজী বেলাল।
প্রবাসে নজরুলচর্চাকে শক্তিশালী করতে অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ‘কাজী নজরুল ইসলাম এন্ডোমেন্ট ফান্ড’-এর অধীনে দুটি স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা উল্লেখযোগ্য। এ বছর ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজে (সিএসইউএন) এই স্কলারশিপ শুরু হয়েছে।
২ মে তরঙ্গের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন খানম শেখ আনুষ্ঠানিকভাবে স্কলারশিপপ্রাপ্ত দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আয়োজকেরা জানান, এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য নিয়ে সেমিস্টারভিত্তিক কোর্স চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বাস্তবায়িত হলে এটি পশ্চিমা উচ্চশিক্ষায় বাংলা সাহিত্য ও নজরুল গবেষণার বড় অগ্রগতি হবে।
এছাড়া নজরুলচর্চা বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রবাসে মানবিক সহায়তা সংগঠিত করতে ‘হোপ অ্যান্ড স্মাইল হিউম্যানিটারিয়ান অর্গানাইজেশন অব লস অ্যাঞ্জেলেস’ নামে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (ত্রিশাল) সঙ্গে একাডেমিক ও গবেষণামূলক সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় ওঠে।
তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি শিপার চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ২০০২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করে তাঁদের সংগঠন। এরপর পশ্চিমা বিশ্বে নজরুলের সাহিত্যকর্ম কীভাবে আরও প্রসার করা যায়, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি জানান, সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজের হিউম্যানিটিজ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করলে আন্তরিক সাড়া পাওয়া যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৭০০ ডলার দিয়ে এন্ডোমেন্ট ফান্ড স্থাপন করা হয়, যা এখন ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে উন্নীত হয়েছে।
প্রতিবছর দেশ-বিদেশের নজরুল–গবেষকেরা সিএসইউএনের লেকচারশিপ প্রোগ্রামে অংশ নেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে নজরুলের বিশাল ভান্ডার সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন এবং একাডেমিক ক্রেডিট অর্জন করেন।
এই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন নজরুল ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক রশীদ হায়দার, সহকারী পরিচালক রিয়াজউদ্দিন স্তালিন, শিল্পী ফেরদৌস আরা, নীলা তাপসী, খিলখিল কাজী, সাংবাদিক শাইখ সিরাজ প্রমুখ। প্রয়াত অধ্যাপক রফিকুজ্জামানও এই উদ্যোগকে উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন।
নজরুল গবেষণায় অবদান রেখেছেন উইনস্টন ল্যাংলি, জুন ম্যাকড্যানিয়েল, নীলা ভট্টাচার্য, গুলশান আরা, নাসিরুদ্দিন, ফিলিস হারমান, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহিত উল আলম প্রমুখ। তাঁদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ নজরুল ইনস্টিটিউটের জার্নালে (ভলিউম ৭) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
শিপার চৌধুরী জানান, তাঁদের পরবর্তী বড় লক্ষ্য ২০২৭-২৮ সেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সেমিস্টার চালু করা। এ বিষয়ে হিউম্যানিটিজ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রতিবছর এই সেমিস্টার চালু রাখতে প্রায় ২০ হাজার ডলার প্রয়োজন হবে। এন্ডোমেন্ট ফান্ডের আয় দিয়ে তা সংকুলান হবে না বলে কমিউনিটির সহযোগিতায় ব্যয়ভার বহনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী সরকারের পক্ষ থেকে এন্ডোমেন্ট ফান্ডে ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন মাহবুবুল হক, মালিকা হক, আহমেদ বশির, নৌরিন রহমান, মোহাম্মদ রাইস, উম্মে রাইস, তারিক চৌধুরী, মামুন খান, শিল্পী ইসলাম, পাপড়ি সরকার প্রমুখ। আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেন সমাজসেবী সৈয়দ নাসির জেবুল, মুনিরুল ইসলাম, আবদুল মুনিম, বদরুল আলম মাসুদ প্রমুখ।
সৈয়দ নাসির জেবুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই অনুষ্ঠানে শিশুদের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের হাত ধরেই ভবিষ্যতে নজরুলের দ্রোহ, প্রেম ও মানবতার দর্শন আরও বিস্তৃতভাবে বিশ্বপরিসরে পৌঁছে যাবে। ‘নজরুল লিগ্যাসি’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের প্রতিফলন।






