কক্সবাজারে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়িয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক বিজিবি সদস্যসহ ঝিনাইদহের দুই তরুণের পরিবারে চলছে গভীর মাতম। বিজিবির সিপাহি নাইমুর ইসলাম ওরফে জিহাদের (২১) মা ছেলের শোকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন, বাবা বাক্রুদ্ধ। একই আবহ আরেক নিহত নাঈম মিয়ার (২১) বাড়িতেও চলছে মর্মান্তিক দৃশ্য।
গত শনিবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির ফোর সিজন রেস্টুরেন্ট এলাকায় মারছা পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। এর মধ্যে দুজনের বাড়ি ঝিনাইদহে।
নিহত নাইমুর ইসলাম ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাজারগোপালপুর গ্রামের চাঁন আলীর ছেলে এবং নাঈম মিয়া সদর উপজেলার পোতাহাটি গ্রামের আনোয়ার খন্দকারের ছেলে। গতকাল রোববার দুপুরে বিজিবি সদস্য নাইমুর ইসলামের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে, নাঈম মিয়ার স্বজনেরা লোহাগাড়া থানা–পুলিশের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণ করে রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দাফন করেন।
দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাইমুর ইসলাম ও নাঈম মিয়া দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক বছর আগে নাইমুর বিজিবিতে চাকরি পান। ছুটিতে বাড়িতে থাকার সুবাদে বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলেন ৪ মে। ফিরে আসার সময় গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাঁদের বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ঘটনাস্থলে মারা যান এক নারী। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান নাইমুর ও নাঈম।
ছেলে নাইমুর ইসলামের মা আমেনা খাতুন ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। পল্লীচিকিৎসক দিয়ে তাঁর চিকিৎসা চলছে। বাবা চান আলী বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কৃষক চান আলী ও আমেনা খাতুন দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে সাড়ে সাত বছর আগে জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী হয়েছেন। ছোট ছেলে নাইমুর ইসলাম ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করেছেন। এরপর বিজিবিতে সিপাহি পদে চাকরি পান। চাকরি পাওয়ার পর মাত্র দুবার ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। দ্বিতীয়বার বাড়ি ফিরে বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরতে যান। সেখান থেকে ফিরলেন লাশ হয়ে।
সোমবার দুপুরে নাইমুর ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বছর দুয়েক আগে দুই কক্ষের একটি পাকা ঘর তৈরি করেছেন কৃষক চান আলী। এখনো প্লাস্টার করতে পারেননি। দুই ছেলের একজনকেও বিয়ে দেননি এখনো। ঘরের মেঝের এক কোণে একটি চৌকির ওপর শুয়ে আছেন আমেনা খাতুন। তাঁর শরীরে স্যালাইন চলছে। পাশেই বসে ছেলের স্মৃতি আওড়াচ্ছেন চান আলী। পাশে আরও কয়েকজন প্রতিবেশী সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
বিছানায় শুয়ে আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে কত খুশি মন নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গেল, আর ফিরল লাশ হয়ে। দুটি ছেলের একজন বিদেশ থাকে। ছোট ছেলেকে চাকরিতে পাঠিয়ে স্বামী-স্ত্রী কত দুশ্চিন্তা করতাম। তবে দুজনই প্রতিষ্ঠিত হবে ভেবে খুশিও হতাম। আমার তরতাজা ছেলেকে অন্ধকার কবরে রেখে আমি কীভাবে থাকব।’ বাবা চান আলী বলেন, ‘আমার বয়স ষাটের কাছাকাছি। কষ্ট করে বড় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ছোট ছেলে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ঝিনাইদহ শহরের সরকারি কেসি কলেজ থেকে আইএ পাস করেছিল। নিজে নিজেই লাইনে দাঁড়িয়ে বিজিবির চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু আজ আমার এ কী হয়ে গেল।’
একই রকম মাতম চলছে পোতাহাটি গ্রামে নিহত নাঈম মিয়ার বাড়িতেও। একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে কেঁদে কেঁদে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা গোলাপী খাতুন। কথা বলতে পারছিলেন না।
নাঈমের চাচা সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁর ভাই আনোয়ার খন্দকার চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নাঈম তাঁর একমাত্র ছেলে ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি মরদেহ আনতে গিয়েছিলাম। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে লাশ পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়েছে। এখন ভাই-ভাবিকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। এই ঘটনায় আমি বাদী হয়ে ঘাতক বাসের চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করেছি লোহাগাড়া থানায়।’






