বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন বিএনপি সরকার এই প্রকল্প শুরু করেছিল। আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারে। এ প্রকল্পের খরচ নির্ধারিত হয়েছে ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা।
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পদ্মা নদীর উপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা হবে। কৃষি ও মাছের উৎপাদনও বাড়বে।
বুধবারের একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজসহ ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের অংশ বলে জানা গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় যা বলছে * খরচ ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা * রাজবাড়ীর পাংশার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ * ২০৩৩ সালে শেষ হবে প্রথম পর্যায়ের কাজ * বছরে ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এত বড় প্রকল্প নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এই প্রকল্পটির বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার রয়েছে। তাই এটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একনেক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারপর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।”
ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছে। এ বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির অভাবে আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই এ বাঁধের মাধ্যমে সেটার প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এখানে পানি জমিয়ে আমরা সারা বছর সরবরাহ করতে পারব।”
প্রকল্পের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, “আমরা আমাদের কাজ শেষ করে প্রকল্পটি একনেকের জন্য পাঠিয়েছি। এখন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”
প্রকল্পে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও ২টি ফিশ পাস। এই বাঁধে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে। সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো তৈরি করা হবে। এছাড়া ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
সংরক্ষিত পানি দিয়ে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে এ নদীগুলোতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা যাবে।
প্রকল্পনথি অনুসারে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে ২৪ লাখ টন ধান ও ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বাড়বে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক-অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে প্রকল্পনথিতে উল্লেখ আছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, সত্তরের দশকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার প্রবাহ কমে যায়। এতে পদ্মার সঙ্গে যুক্ত ছয়টি নদী শুকিয়ে যায়। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌচলাচল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় পদ্মা একমাত্র সুপেয় পানির উৎস। এসব এলাকার উন্নয়ন পানি ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ককালে নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। কাজ চলবে ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত।
একসময় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এটা কোনো নতুন প্রকল্প নয়। ১৯৬৪ সালে এটার আলোচনা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে আমরা এর স্থান নির্ধারণ করি। বাঁধটি নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত সরকার। তবে পরে নানা রাজনৈতিক কারণে তা আটকে যায়।” প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানালেও উপকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে তিনি মনে করেন। তবে অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, “পানির সংকট, সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ত ও পলি জমে জলাবদ্ধতার সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই স্বাদু পানির সরবরাহ বাড়াতেই হবে। সে জন্য এ বাঁধ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”
বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালে এ ধরনের প্রকল্পের আলোচনা হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে প্রাথমিক প্রস্তাবনা ছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড নকশা প্রণয়নে কাজ করে।






