কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এমন অণুর সন্ধান করছেন, যা আকৃতি বদলে শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং প্রয়োজনে আগের রূপে ফিরে সেই শক্তি ছেড়ে দিতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় মলিকুলার সোলার থার্মাল এনার্জি স্টোরেজ। এটি অনেকটা ইঁদুর ধরার ফাঁদের মতো—প্রথমে শক্তি দিয়ে সেট করা হয় এবং পরে ট্রিগার টিপে শক্তি মুক্ত করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার বিজ্ঞানী গ্রেস হান এই জ্বালানিবিহীন শক্তি সঞ্চয়ের নতুন পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি যখন মানুষের ত্বকে পড়ে, তখন ডিএনএ অণু স্বাভাবিক আকৃতি ছেড়ে সংকুচিত বা বিকৃত হয়ে যায়। এই সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়াই এখন নতুন শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তির পথ দেখাচ্ছে।
বোস্টন থেকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ভ্রমণের সময় গ্রেস হান তাঁর ত্বকে রোদে পোড়ার অস্বস্তি বোধ করেন। তখনই তাঁর মনে এক যুগান্তকারী গবেষণার চিন্তা আসে। তিনি বুঝতে পারেন, লাখ লাখ বছরের বিবর্তনে ত্বকের ডিএনএ অণুগুলো এই কাজে দক্ষ হয়েছে। সূর্যের তাপে বিকৃত হওয়ার পর ফটোলাইজ নামক এনজাইমের সাহায্যে এই অণুগুলো আবার আগের আকৃতিতে ফিরে আসতে পারে। হানের মতে, এগুলো ওজনে হালকা হলেও প্রচুর শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম।
এক গবেষণাপত্রে গ্রেস হান ও তাঁর দল এই প্রযুক্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল ফলাফল তুলে ধরেছেন। তাদের তৈরি মলিকুলার সিস্টেম এত শক্তিশালী যে এক ভায়াল পানি দ্রুত গরম করতে পারে। হান বলেন, ‘যখন আমি ভিডিওতে দেখলাম পুরো দ্রবণটি কত দ্রুত ফুটছে, সেটি সত্যিই অভাবনীয় ছিল।’
গবেষণার সময় ইউসিএলএর অধ্যাপক কেন্ডাল হাউক ও তাঁর দল কম্পিউটার বিশ্লেষণ করে অণুর কার্যকারিতা আগাম অনুমান করেছিলেন, যা সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার গবেষক ক্যাসপার মথ-পলসেন জানান, হানের পদ্ধতি ১.৬ মেগাজুল শক্তি সঞ্চয় করছে। প্রতি কেজিতে ১.৬৫ মেগাজুল শক্তি ঘনত্ব বর্তমানে ফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ির লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে অনেক বেশি।
গবেষণাগারে সফলতা সত্ত্বেও প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী জন গ্রিফিন বলেন, অণু সক্রিয় করতে ৩০০ ন্যানোমিটারের কড়া অতিবেগুনি রশ্মি দরকার, যা সূর্য থেকে পৃথিবীতে খুব কম আসে। তাছাড়া, শক্তি নির্গতের জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের মতো ক্ষয়কারী রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব ডুইসবার্গ-এসেনের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হ্যারি হোস্টারের মতে, এই প্রযুক্তিতে কিছু ব্যবহারিক জটিলতা রয়েছে। আলোক সংবেদনশীল অণুগুলো পাতলা স্তরে ছড়াতে হয় এবং তরল পাম্প করলে যন্ত্র নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে জন গ্রিফিন ও গ্রেস হান এখন এর কঠিন সংস্করণ নিয়ে কাজ করছেন। এটি জানালার কাচের কোটিং হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হবে, যা শীতকালে ঘর গরম রাখবে বা কুয়াশা রোধ করবে।
সূত্র: বিবিসি






