ডাচ লেখক রুটখার ব্রেগমান তাঁর ‘হিউম্যানকাইন্ড: আ হোপফুল হিস্ট্রি’ বইয়ে লিখেছেন, মানুষকে হত্যা করা মানুষের জন্য মোটেও সহজ নয়, তাই মানুষ দূর থেকে বুলেট ছোড়ে—মানুষের সহিংসতা ও যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে।

তবু কখনো কখনো কেউ এমন অন্ধকারে ডুবে যায় যে নিজের সন্তানের মুখও তাকে থামাতে পারে না। তখন কাছ থেকেই ওঠে হন্তকের হাত। সবচেয়ে পরিচিত ও কাছের মানুষগুলোই হয় শিকার। যারা তাকে শেষ আশ্রয় মনে করত, তাদেরই হত্যা করে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় গত শুক্রবার এক নারী, তাঁর তিন সন্তান ও তাঁর ভাইকে হত্যার ঘটনায় অনেকের মনে জেগেছে প্রশ্ন: একজন বাবা কেন নিজের সন্তানদের হত্যা করবেন?

পুলিশ ও স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, তিন শিশুর বাবাই এ হত্যাকাণ্ড করেছেন। হত্যার পর তিনি ভাইকে ফোন করে বলেন, “সবাইকে শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।” পরে স্বজনরা গিয়ে ঘর থেকে লাশগুলো উদ্ধার করেন। হত্যার আগে রাতে স্থানীয় লোকেরা তাকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাসার পাশের দোকানে চিপস-চকলেট কিনতে দেখেছিলেন।

প্রতিবেশী আরিফুল ইসলাম বলেন, “এই ঘটনা দেশের মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একজন বাবা কীভাবে এমন কাজ করতে পারে, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা কেমন নৃশংসতা।”

আরিফুলের মতো অনেকের কাছে খবরটি অবিশ্বাস্য। সাধারণত বাবারা সন্তানের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। সন্তান ভালো থাকুক, খাক, বড় হোক—এটাই বেশিরভাগ বাবার চাওয়া। অনেকে নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের জন্য লড়েন। সেই বাবাই সন্তান হত্যা করলে এটি শুধু আইনের বিষয় নয়, মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নও।

বিখ্যাত মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনকে তিন স্তরে ভাগ করেছিলেন—ইড, ইগো ও সুপার ইগো। ‘ইড’ মানবমনের আদিম অংশ, চাহিদা, তাড়না, রাগ, লালসা বা তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষার জায়গা। এটি দ্রুত তৃপ্তি চায়, সামাজিক নিয়ম বা নৈতিকতা মানে না।

‘ইগো’ বাস্তবতা থেকে কাজ করে, প্রবৃত্তি ও বাইরের জগতের মধ্যে সমন্বয় করে। ‘সুপার ইগো’ নৈতিক বোধ, ঠিক-ভুলের ধারণা দেয়।

মনোবিজ্ঞানে দেখা যায়, দীর্ঘ হতাশা, দাম্পত্য সংকট, দমিত ক্ষোভ বা মানসিক চাপে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়। তখন আবেগ বা রাগ আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো একক তত্ত্বে হত্যা ব্যাখ্যা যায় না। পারিবারিক সহিংসতায় মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ হেলাল উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হত্যাকাণ্ড সাধারণত দুই ধরনের—পরিকল্পিত বা ‘প্রিমেডিটেটেড’, এবং তাৎক্ষণিক আবেগ থেকে ‘ইমপালসিভ’।

ডা. আহমেদ হেলালের মতে, কাপাসিয়ার ঘটনা কোন ধরনের তা এখন নিশ্চিত বলা যায় না। এক আচরণ দেখে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। এর জন্য সামগ্রিক ‘মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট’ দরকার।

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, সাইকোসিস, সিজোফ্রেনিয়া বা মাদকনির্ভরতায় সহিংসতা হতে পারে। তবে এ ঘটনায় তা ছিল কি না, তদন্ত ছাড়া বলা যায় না।

কাপাসিয়া ঘটনায় ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, আগে থেকে কাউকে মানসিকভাবে অসুস্থ বললে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে, হত্যাকে ছোট করে দেখার ঝুঁকি থাকে।

হত্যাকাণ্ডের শিকার ও অভিযুক্ত সবার বাড়ি গোপালগঞ্জে। অভিযুক্ত কাপাসিয়ায় পরিবার নিয়ে পাঁচ বছর ধরে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তিনি প্রাইভেট কার চালাতেন। শ্যালক গাজীপুরে কারখানায় কাজ করতেন। ৪০ বছর বয়সী অভিযুক্তের স্ত্রী ৩০ বছরের, সন্তান তিনটির বয়স ১৫, ৮ ও ২ বছর।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের কথা অনুযায়ী, অভিযুক্তের সঙ্গে স্ত্রীর দীর্ঘদিন দাম্পত্য কলহ চলছিল। কারণ, দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা। প্রতিবেশীরা ঝগড়ার শব্দ প্রায়ই শুনতেন।

কয়েক মাস আগে স্ত্রীকে মারধর করে হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে স্ত্রী বাবার বাড়ি যান, আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ফেরার পর স্ত্রী বলেছিলেন, “তিনটা বাচ্চা নিয়ে আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।”

ভাইকে ফোন করে অভিযুক্ত বলেন, “সবাইকে মাইরা ফেলছি, আমারে আর পাবি না।” লাশের পাশে গোপালগঞ্জ সদর থানা বরাবর অভিযোগের কাগজ পাওয়া গেছে। সেখানে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিযুক্তের লেখা বলে ধারণা।

মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, অপরাধের পর মানুষ নিজেকে রক্ষা বা দায় সরানোর চেষ্টা করে, সচেতন বা অবচেতনভাবে।

হত্যার পর ভাইকে ফোনকে অনেকে অপরাধবোধের প্রকাশ মনে করছেন। অভিযুক্ত বলেছিলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।”

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, হত্যার আগে-পরে মানসিক অবস্থা এক নয়। আগে রাগ-ক্ষোভ, পরে অপরাধবোধ বা আতঙ্ক আসতে পারে। অপরাধের পর যোগাযোগ করে চাপ কমানোর চেষ্টা হয়, আবেগের অবনমন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভয়াবহ সহিংসতার পর অনেকে বাস্তবতায় ফিরে অপরাধবোধ বা আত্মধ্বংসী হয়ে পড়েন। এ কারণে খুনের পর আত্মহত্যাও হয়।

দাম্পত্য কলহকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, পারিবারিক সহিংসতা হঠাৎ হয় না। দীর্ঘ ক্ষোভ, অশান্তি, চাপ ধীরে ভয়াবহ করে।

সাদেকা হালিম বলেন, বদ্ধ পরিবেশে অসন্তোষ জমে সহিংসতা তৈরি হয়। দেশে এ ঘটনা বাড়লেও প্রতিরোধে উদ্যোগ সীমিত। সেমিনার-কাউন্সেলিং নির্দিষ্ট শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ। নিম্নবিত্তে সহায়তা কম পৌঁছে। অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, মাদক, টানাপোড়েন মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়। অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে বা অন্য সম্পর্কে আশ্রয় খোঁজেন, নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী, ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব আছে। ঘরে অশান্তিতে পক্ষপাতিত্ব বাড়ায় সংকট। কাউন্সেলিং ও সহমর্মিতা জরুরি।

কোনো বিশ্লেষণই হত্যাকে বৈধ করে না। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, পারিবারিক অশান্তি, দ্বন্দ্ব, মানসিক সংকটকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না। মানুষের বোধ অন্ধকার গ্রাস করলে নিরাপদ ঘরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।