বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সংকট নিয়ে আলোচনা চললেও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গবেষণা বাস্তবতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। এটি কেবল উদ্বেগজনকই নয়, শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও জাগিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাই অর্জন করতে পারেনি। গণিতে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই আটকে আছে, বাংলায়ও পরিস্থিতি উন্নত নয়। আরও চিন্তার বিষয়, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নিজেদের শ্রেণি অনুযায়ী পাঠই পড়তে অক্ষম। এই শিখনঘাটতি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন।

সংকটের মূলে রয়েছে ‘শেখানো’ নয়, ‘সিলেবাস শেষ করা’র প্রবণতা। গবেষণায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, পাঠ্যসূচি শেষ করার চাপে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নির্দিষ্ট সময়ে বই শেষ করা, শিক্ষার্থীরা শিখেছে কি না তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এতে দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়ছে, শিক্ষকরাও অকার্যকর কাঠামোর সঙ্কটে আটকে পড়ছেন।

পাঠ্যক্রম কাদের জন্য—এটাই এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যদি তার সঙ্গে তাল মিলাতে না পারে, তাহলে যতই আধুনিক হোক না কেন, এর কার্যকারিতা থাকে না। ইউনিসেফের গবেষকেরা যথার্থই বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় পুরো শ্রেণিই প্রত্যাশিত মানের নিচে। সমস্যা কয়েকজন দুর্বল শিক্ষার্থীর নয়, গোটা ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পাঠ্যক্রমে একের পর এক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি প্রধান শিক্ষক মনে করেন, ঘন ঘন পরিবর্তন শিক্ষার মানোন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। নতুন পদ্ধতি চালু করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, শিখনসামগ্রী বা মূল্যায়নকাঠামো ছাড়াই পরিবর্তন চাপানো হয়েছে। ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—সকলে বিভ্রান্ত। গবেষণায় উল্লেখ আছে, বছর শুরুতে ৯৩ শতাংশ শিক্ষক নতুন মূল্যায়নপদ্ধতিতে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, বছর শেষে তা নেমে এসেছে ৫৪ শতাংশে। অর্থাৎ শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিবর্তন টেকসই হয় না।

শিক্ষকদের ভূমিকা নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। তাঁরা শুধু পাঠ্যবই শেষ করার যন্ত্র নন, শিক্ষার্থীর শেখার সঙ্গী। কিন্তু প্রশাসনিক কাজ, পরীক্ষা, বৈরী আবহাওয়া, স্কুল বন্ধ, উপকরণের অভাবে তাঁদের কাজ বাধাগ্রস্ত। দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় শিখনসামগ্রী ব্যবহারে পর্যাপ্ত সময় পান না। শিক্ষককে নির্দেশনাপালনকারী কর্মচারী বানালে শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীলতা বা মানবিক সংযোগ গড়ে ওঠে না।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত ফল কোথায়? এর উত্তর খুঁজতে বাজেট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, অর্থের ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন দরকার। শিক্ষা খাতের সাফল্য নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতায়, অবকাঠামো বা প্রকল্পের সংখ্যায় নয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক সন্ধিক্ষণে। নতুন পাঠ্যক্রম বা প্রযুক্তি দিয়ে সংকট সমাধান হবে না। শিক্ষা হতে হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, সিলেবাসকেন্দ্রিক নয়। ইউনিসেফের এই গবেষণা শিক্ষার জন্য বড় সতর্কবার্তা। শিখনঘাটতি কমাতে নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।