বাংলাদেশের রপ্তানির ঝুড়িতে বৈচিত্র্য যোগাতে গাছের চারা নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে আমাদের ফল ও ফুলের চারার চাহিদা বেড়ে উঠছিল। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় সোয়া লাখ ডলার ছাড়িয়েছিল। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে তা ১১ হাজার ডলারে নেমে আসা কেবল হতাশাজনকই নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার প্রতিফলন।

চারা রপ্তানির হ্রাসের পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মানুষের সৃষ্ট সংকট ও নীতিগত বাধাই মূল কারণ। প্রথমত, চারা রপ্তানির অপরিহার্য উপাদান ‘কোকোপিট’ (নারকেলের ছোবড়া) সংগ্রহে তীব্র সংকট। দেশে যথেষ্ট উৎপাদন না থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা, যাতে উচ্চ আমদানি শুল্ক চাপানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কৃষিপণ্য হলেও চারা রপ্তানিতে ১০ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা পাওয়া যায় না, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহনের অভাব এবং বিমান ভাড়ার উচ্চতা খাতটিকে পঙ্গু করে তুলছে।

বিশ্ববাজারে নেদারল্যান্ডস ফুল ও চারা রপ্তানি করে বছরে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার আয় করছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো উর্বর মাটির দেশে এই খাতের এমন করুণ অবস্থা সহ্য করা যায় না। আম, কাঁঠাল বা লেবুর চারার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আমরা কেন বাজার হারাচ্ছি? রপ্তানিকারকরা বিদেশি মেলায় অংশ নিতে পারছেন না, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ছয় মাস ফাইটোস্যানিটারি সনদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়—এতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ নষ্ট হচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। ইপিবি বলছে, আবেদন করলে তালিকায় যুক্ত করবে, কিন্তু উদ্যোক্তারা বছরের পর বছর লড়াই করেও নীতিসহায়তা পাচ্ছেন না। এই ‘আবেদন-নিবেদন’ সংস্কৃতির ফাঁদে একটি সম্ভাবনাময় খাত বলি দেওয়া হচ্ছে।

আমরা আশা করি, গাছের চারাকে অবিলম্বে কৃষিপণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া হবে। কোকোপিট আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার বা দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। বিমান ও সমুদ্রপথে চারা পরিবহনের বিশেষ হার নির্ধারণ এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনটেইনার সুবিধা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় চারা প্রদর্শনী বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে নতুন ক্রেতা তৈরি হয়।

চারা রপ্তানি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস নয়; এর সঙ্গে নার্সারিশিল্পের উন্নয়ন এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সরকারের উচিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এই খাত রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।