ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবে গোলের উল্লাস, পতাকার রঙিন ঢেউ, রাত জাগরণ আর আবেগের বিস্ফোরণ—এসবের পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন এক প্রতিপক্ষ নিয়ে কথা উঠেছে। সেই প্রতিপক্ষের নাম ‘আবহাওয়া’।
আর মাত্র এক মাস বাকি ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর। যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশে স্টেডিয়ামগুলো প্রস্তুত, দলগুলো শেষ পরিকল্পনায় মগ্ন। কিন্তু মাঠের বাইরে এখন বড় প্রশ্ন—গ্রীষ্মের এই আবহাওয়া কি টুর্নামেন্টের ছন্দ নষ্ট করে দিতে পারে?
উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্ম শুধু রোদেলা নয়, এখানে প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা, বজ্রঝড়, তাপপ্রবাহ এমনকি দাবানলের ধোঁয়াও। ফলে এই বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ শুধু অন্য দল নয়, প্রকৃতিও হয়ে উঠেছে।
গরমকে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু করে ফিফা ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য প্রতি ম্যাচের দুই অর্ধেকে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের ‘কুলিং ব্রেক’ রাখা হবে।
এ সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া নয়। গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে গরম ও বজ্রঝড়ে ছয় ম্যাচ ব্যাহত হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল চেলসি-বেনফিকা ম্যাচ, যা প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল। ম্যাচের পর চেলসির তৎকালীন কোচ এনজো মারেসকা বলেছিলেন, “এ ধরনের টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সঠিক জায়গা নয়।”
আয়োজক শহরগুলোর অনেকটাই গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরমের জন্য কুখ্যাত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চল। সেখানে দিনের তাপমাত্রা সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তাপপ্রবাহে ৪০ ডিগ্রি ছুঁতে পারে।
সমস্যা কেবল তাপমাত্রায় নয়, আর্দ্রতাই আসল ভয়। আর্দ্রতা বাড়লে শরীর ঘাম দিয়ে ঠান্ডা হয় না, ফলে অনুভূত তাপমাত্রা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি। এই বিশ্বকাপে তাই বারবার শোনা যাবে ‘ফিলস লাইক’ শব্দ, অর্থাৎ শরীরে কতটা গরম লাগছে।
যেমন মায়ামিতে ৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রা হলেও আর্দ্রতায় ৪৩ ডিগ্রির মতো অনুভূত হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ বা ডব্লিউবিজিটি। এটি শরীরের উপর তাপের চাপ মাপে। সাধারণত ২৮ ডিগ্রি ডব্লিউবিজিটিকে বিপজ্জনক বলা হয়, কারণ তখন তাপজনিত ঝুঁকি বাড়ে।
২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োমিটারোলোজিতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৬টি আয়োজক শহরের ১৪টিতে গ্রীষ্মের দুপুরে ডব্লিউবিজিটি ২৮ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। মায়ামি, হিউস্টন, ডালাস, মন্তেরেই, কানসাস ও আটলান্টায় বিকেলে এটি ৩২ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে, যা ‘চরম তাপজনিত চাপ’।
ঝুঁকি কমাতে বেশিরভাগ ম্যাচ বিকেল বা সন্ধ্যায় রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রুপ ‘সি’র স্কটল্যান্ড বনাম ব্রাজিল ম্যাচ শুরু হবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায়। হিউস্টন ও ডালাসের স্টেডিয়ামে খোলা-বন্ধযোগ্য ছাদ ও তাপ নিয়ন্ত্রণ সুবিধা রয়েছে।
তবু প্রকৃতির সামনে সব হিসাব অসহায়। গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ ডিগ্রি বা তার বেশি বাড়তে পারে। বিশ্বকাপ ফাইনাল ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক সিটিতে স্থানীয় সময় বেলা তিনটায়। তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৩৪-৩৬ ডিগ্রি, ডব্লিউবিজিটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি হতে পারে।
ম্যাচে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিঘ্ন বজ্রঝড় হতে পারে। উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মের বিকেলে মায়ামি, হিউস্টন, আটলান্টায় ঝড় সাধারণ। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মে স্টেডিয়ামের ১০ মাইলের মধ্যে বজ্রপাত হলে খেলা বন্ধ, শেষ বজ্রপাতের ৩০ মিনিট পর শুরু। সম্প্রতি মায়ামি গ্রাঁ প্রির সূচি তিন ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছিল বজ্রঝড়ের আশঙ্কায়। হার্ড রক স্টেডিয়ামের পাশে সেই রেস, সেখানেই বিশ্বকাপ ম্যাচ হবে।
আরেক উদ্বেগ দাবানল। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলের মৌসুম আগেই শুরু। ২০২৩ সালে কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিউইয়র্ক সহ অনেক শহরে ছড়িয়ে বায়ুমান খারাপ করে। ফিফার বায়ুমান নিয়ে নির্দিষ্ট সীমা নেই, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হবে।
খেলোয়াড়-কোচের পাশাপাশি দর্শকদের জন্যও চ্যালেঞ্জিং। গরমে স্টেডিয়াম বা ফ্যান জোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকা কষ্টকর। বজ্রঝড়ে ম্যাচ দেরি বা দর্শক সরাতে হতে পারে। ম্যাচ পিছিয়ে গেলে ভ্রমণ, হোটেল, পরিবহন এলোমেলো। ইংল্যান্ডের দর্শকদের অনেক ম্যাচ গভীর রাতে, ঝড়ে আরও দীর্ঘ হবে।






