ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারের ঘোড়দহ এলাকায় সড়কের পাশে একটি শতবর্ষী বটগাছে রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে। একসময় এই গাছের ডালে নানা পাখি বাসা বাঁধত, কান পাতলেই শোনা যেত তাদের কিচিরমিচির। কিন্তু এখন সেই ডালগুলোতে চেয়ার-টেবিল বসানো হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করে আসছেন, ছবি তুলছেন, খাবার খাচ্ছেন। এই কোলাহলে পাখির স্বাভাবিক শব্দ হারিয়ে গেছে।
কাপাশহাটিয়া বাঁওড়ের ধারের এই বটগাছটি ছায়াঘেরা ও পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় দুই যুবকের উদ্যোগে তৈরি এই ব্যতিক্রমী রেস্তোরাঁর নাম ‘বৃক্ষবিলাস ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিন প্রচুর মানুষ এখানে ভিড় করছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দূর থেকে আসছেন কেউ খাবার খেতে, কেউ রেস্তোরাঁ দেখতে। তারা গাছের ডালে ঘুরছেন, ওপরে বসে খাচ্ছেন।
ঝিনাইদহ শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ঝিনাইদহ-হরিণাকুণ্ডু সড়কের চারাতলা বাজারের পাশে এই রেস্তোরাঁ। হলিধানি বাজার হয়ে কাতলামারী-চারাতলা সড়ক দিয়েও সহজে পৌঁছানো যায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, গাছের ওপরের দিক সবুজ পাতায় ভরা, চারপাশে ছোট-বড় ডাল ছড়ানো। মাটি থেকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচুতে ডালগুলো মিলিয়ে বাঁশ-কাঠ দিয়ে রেস্তোরাঁ তৈরি। ডালে ডালে এখনো শালিক ও অন্য পাখির পরিত্যক্ত বাসা ঝুলছে। ফাস্টফুড জাতীয় খাবার গাছের নিচে তৈরি হচ্ছে। গাছের গায়ে লাগানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ওপরে চেয়ার-টেবিল রাখা। পাঁচ-ছয়জন কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী গাছের ওপর বসে মজা করছিলেন, তবে পাখির কিচিরমিচির শব্দ নেই।
ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বলেন, তাঁরা ফেসবুকে দেখে এসেছেন। জায়গাটি ভালো লাগছে। তবে এই গাছের ওপর রেস্টুরেন্ট গাছের ক্ষতি করবে। গাছটির স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, এই গাছ ছায়া দেয়, সেখানে নানা প্রজাতির পাখি বসে; কিন্তু এখানে রীতিমতো একটি হোটেল তৈরি হওয়ায় সবকিছুর ছন্দপতন ঘটবে।
ঝিনাইদহ শহরের চাকলাপাড়ার বাসিন্দা শিউলি খাতুন রেস্তোরাঁয় এসে উচ্ছ্বসিত। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন কিছু হবে ভাবতেই পারিনি। এখন অনেক মানুষ আসছেন, এতে এলাকাও পরিচিত হচ্ছে।’ হলিধানী এলাকার আয়নাল হোসেন জানান, ন্যায্যমূল্যের খাবারের পাশাপাশি গাছের ডালে বসে খাওয়া ভালোই লাগছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, গাছ ও পরিবেশের ক্ষতি হয় তেমন কিছু তাঁরা করছেন না। তবে পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলছেন, শতবর্ষী বটগাছে রেস্তোঁরা করে গাছটিকে হত্যার আয়োজন করা হয়েছে। বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির জেলা আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, শতবর্ষী এই বটবৃক্ষে এভাবে রেস্তোঁরা তৈরি কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। তাঁর দাবি, এতে গাছটি আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবে। কারণ, এখানে খাবারের জন্য মানুষের আনাগোনা, গাছের নিচে ময়লা ফেলা, রান্নাবান্নার কাজ করা, নিজেদের ব্যবহারোপযোগী করতে গাছের ডাল ছাঁটা, ডালে বাঁশ-কাঠ বেঁধে গাছটিকে বাড়তে না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া মানুষের আনাগোনায় গাছে যে পাখিরা বসবাস করত, তারা সরে যেতে বাধ্য হবে। গাছটিকে তার স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেওয়া হবে না।
রেস্তোরাঁটির উদ্যোক্তাদের একজন আবির হাসান। তিনি বলেন, এইচএসসি পাসের পর ঝিনাইদহের ডাকবাংলা বাজারে একটি পোশাকের দোকানে কাজ করতেন। কিছুদিন পর নিজের মাথায় আসা চিন্তা থেকে এই রেস্তোরাঁ গড়েছেন। ঘোড়দহ গ্রামের আব্দার মোল্লার জমির এক প্রান্তে থাকা শতবর্ষী বটগাছকে বেছে নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। গাছের ক্ষতি হয় তেমন কিছু করছেন না দাবি করে আবির হাসান আরও বলেন, জায়গাটি অপরিষ্কার ছিল। তাঁরা পরিষ্কার করে সেখানে রেস্তোরাঁ করেছেন। যাঁরা খাবার খেতে আসবেন, তাঁদের বসার জন্য নিচেও তিনটি ঘর করা হয়েছে। পাশাপাশি গাছের ডালেও একটি বসার জায়গা করা হয়েছে। অনেকে সেখানে বসে খাবার খাচ্ছেন, আবার অনেকে ওপরে ঘুরে দেখে নিচে এসে খাবার খাচ্ছেন।
স্থানীয় কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল হাকিম জানান, গত রোজার ঈদের আগে তাঁরা এই রেস্তোরাঁ তৈরি করেন, এখনো চলছে। গাছের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত কোনো ক্ষতি তাঁরা দেখছেন না।
তবে ঝিনাইদহ বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, কোনোভাবেই এটা করা ঠিক হয়নি। এতে গাছের মারাত্মক ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, আগে তাঁরা কখনো শোনেননি বা দেখেননি গাছের ওপর রেস্তোরাঁ। যে কারণে বন বিভাগের আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করবেন বলে জানান। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক মো. মুনতাসির রহমান বলেন, গাছ কোনো বিনোদনের জায়গা না। এই গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, পাখিরা বাসা বাঁধে, মানুষ কাঠের সুবিধা নেয়। এগুলোর সুযোগ হারাবে। গাছটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে পড়েছে, নাকি সরকারি জমিতে পড়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ রায়।






