দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি নেত্রকোনার ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সংবাদে পুরো দেশ স্তম্ভিত। ভুক্তভোগী শিশুটির মা যে চিকিৎসকের কাছে শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি জানাচ্ছেন, তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা এটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। সংসদে এ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না। এ থেকেই স্পষ্ট যে, ধর্ষণ কেন প্রতিনিয়ত ঘটছে। এই বক্তব্যের গভীর অর্থ ব্যাখ্যা করা ক্লান্তিকর। যাঁরা বুঝবেন, তারা এটুকু থেকেই বুঝবেন। যাঁরা বুঝবেন না, তাঁরা শতবার বোঝালেও বুঝবেন না।

যেসব দেশে আইনের শাসন আছে, সেখানেও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধর্ষককে রক্ষা করার ধ্বংসাত্মক প্রবণতা দেখা যায়। হলিউডে মেয়েরা পরিচালক বা সহ–অভিনেতাদের বিরুদ্ধে, এমনকি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতেও মেয়েরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে। এসব পুরুষতান্ত্রিকতার উদাহরণ, যা ধর্ষককে রক্ষা করতে চাওয়ার মূল কারণ।

মানুষকে ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, খেলাধুলায় ও শরীরচর্চায় নিয়োজিত করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে। নান্দনিক কাজ যেমন চিত্রকলা, গান–বাজনা, গল্প-কবিতা পাঠ ও লেখা, প্রতিযোগিতা ও আকর্ষণীয় পুরস্কার, নাটক, যাত্রা, ফিল্ম, থিয়েটার এবং খেলাধুলা ও শরীরচর্চার জন্যও থাকা দরকার আকর্ষণীয় পুরস্কার। এ জন্য সরকারি বরাদ্দ দরকার। দরকার ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক ও স্পোর্টস সেন্টার গড়ে তোলা।

ক্ষমতাসীন দল যদি তার লোকদের রক্ষা করে, পুলিশ যদি সদস্যদের বাঁচায়, প্রতিষ্ঠান যদি বিচার না করে, পিতা যদি সন্তানকে আইনের হাতে না সোপর্দ করে, মা যদি নিকটাত্মীয়ের দ্বারা কন্যার নিগ্রহে প্রতিবাদ না করে, তাহলে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ কখনো বন্ধ হবে না। আমরা যত ধর্ষণের ঘটনা জানি, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বাস্তবে ঘটে। বিশেষ করে গৃহপরিচারিকা ও গার্মেন্টস সেক্টরে অনেক নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে মালিক ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুগ যুগ ধরে এসব করছেন। প্রায় সব কর্মক্ষেত্রেই নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার, কিন্তু দেখার কেউ নেই।

ধর্ষণের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক, জৈবিক, সাংস্কৃতিক ও অবস্থাগত কারণ রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে প্রধান হলো, ধর্ষকের প্রথম জীবনে যৌনতা ও নারীপ্রকৃতি সম্পর্কে বিকৃত ধারণা গড়ে ওঠা। বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞান বলে, শিশুর মন যা নিয়ে জন্মায়, সংস্কৃতি তার গঠন করে। এই তত্ত্ব জেনেটিক প্রভাব বাদ দিয়ে সমাজ-সংস্কৃতির প্রভাবকে প্রধান মনে করে।

রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির লেনিন লিখেছেন, ‘প্রেম হলো যৌনতা ও সংস্কৃতির সমন্বিত রূপ।’ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম উপায় যৌনতৃপ্তি...শুধু কামে তৃপ্তি নেই, তা পরিণামে ক্লান্তি ও অবসাদ নিয়ে আসে। প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েই কাম স্নিগ্ধ ও তৃপ্তিকর হয়ে ওঠে’—এতে তিনি লেনিনের প্রতিধ্বনি করেন।

যৌনতার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ না থাকলে তা সহিংসতা, যৌনসন্ত্রাস ও ধর্ষণে রূপ নেয়। শিশু কী শিক্ষা পায় এবং কী সংস্কৃতিতে বড় হয়—তাই নির্ধারণ করে তার যৌনতা, নারী ও প্রেমের দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্ষণ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রেমের প্রসঙ্গ আসবেই, কারণ নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের একমাত্র মাধ্যম প্রেম-ভালোবাসা। এই শিক্ষার অভাবেই ধর্ষণের মহামারি।

ধর্ষণের একটা প্রধান কারণ হলো, নারীকে ব্যক্তি হিসেবে দেখতে না পারা। অধিকাংশ পুরুষ নারীকে ভোগ্য বস্তু মনে করে। যেন সমাজের সদস্য শুধু পুরুষ, নারী হলো ব্যবহার্য উপকরণ। আরেক কারণ, নারীর মন-শরীর সম্পর্কে পুরুষের জ্ঞানের অভাব। তারা মনে করে গায়ে হাত দিলেই ভালো লাগবে, কিন্তু নারী চায় শুধু ভালোবাসার মানুষই তাকে স্পর্শ করুক।

এই গুরুতর বিষয়ে তাৎক্ষণিক জাতীয় কমিটি গঠন দরকার। কমিটিতে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, যৌনতত্ত্ববিদ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভিন্নমতের বিশেষজ্ঞদের সমাহার থাকবে।

কমিটি ধর্ষণের কারণ-প্রতিকার খুঁজবে, কিন্তু স্পষ্ট যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কৃতিমান মানুষ তৈরি করতে পারছে না। নারীকে ব্যক্তি হিসেবে দেখা, তার দেহ-মন সম্পর্কে সঠিক ধারণা সৃষ্টিতে আমরা ব্যর্থ। সংস্কৃতি সৌন্দর্যচেতনা, শ্রেয়বোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, প্রেম, যৌনতা, অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা সৃষ্টি করে।

সমাজের সবাইকে ইহজাগতিক সংস্কৃতির ছায়ায় নান্দনিকতা ও প্রেম নিয়ে বাঁচতে হবে। রেনেসাঁর মূল সুরে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎ ভাবে বাঁচা;...কাব্যপাঠের মারফতে ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাঁদের চাওয়ায় বাঁচা; আকাশের নীলিমায়, তৃণগুল্মের শ্যামলিমায় বাঁচা, বিরহীর নয়নজলে, মহতের জীবনদানে বাঁচা... নর-নারীর বিচিত্র সুখ-দুঃখে বাঁচা...দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বাঁচা। বাঁচা, বাঁচা, বাঁচা। প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাঁচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা।’

প্রস্তাবিত কমিটি আমার সঙ্গে একমত হবেন—পর্নোগ্রাফি ধর্ষণের বড় কারণ। ইন্টারনেটে মুঠোফোনে এর প্রচলন হয়েছে। এ নিয়ে গভীর চিন্তা দরকার।

মানুষকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, খেলাধুলায়, শরীরচর্চায় নিয়োজিত করলে সুফল পাওয়া যাবে। চিত্রকলা, গান–বাজনা, গল্প-কবিতা, প্রতিযোগিতা, নাটক, যাত্রা, ফিল্ম, থিয়েটার, খেলাধুলায় আকর্ষণীয় পুরস্কার দিতে হবে। সরকারি বরাদ্দ ও সাংস্কৃতিক-স্পোর্টস সেন্টার গড়ে তোলা দরকার।

এসবের পাশাপাশি আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে কমে—এমন প্রমাণ নেই। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তিন মাসের রায়, জামিন না দেওয়া, আমৃত্যু শাস্তি হলে ধর্ষক বুঝবে শাস্তি এড়ানো যাবে না—তবেই ধর্ষণ কমবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির, বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। [email protected]