অভিনেতা তৌসিফ মাহবুবের চোখের সামনে মায়ের শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সেই দৃশ্য এখনো তাঁর মনে ভয় জাগায়। মা দিবসে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে তিনি সেই ঘটনার স্মৃতি শেয়ার করলেন, যেদিন ছোট তৌসিফ একাই মাকে হাসপাতালে নিয়ে সবার প্রশংসা লাভ করেন।

তৌসিফ জানান, প্রায় ২৫ বছর আগের ঘটনা। এক শীতের সন্ধ্যা। তখন তিনি ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়তেন। স্কুল ছুটির পর স্বাভাবিকভাবে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। সাধারণত বাবা বা খালু নিতে আসতেন। সাড়ে পাঁচটায় ছুটি হলেও সেদিন ছয়টা পেরিয়ে যায়, কিন্তু কেউ আসেনি।

বন্ধুরা চলে যাচ্ছে, তৌসিফ অভিমান আর রাগে দারোয়ানের রুমে বসে আছেন। শুটিং ইউনিট থেকে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমাকে কেউ নিতে না আসায় আমি একা বসে ছিলাম দারোয়ানের রুমে। একা বাসায় যাওয়া কঠিন ছিল। কারণ, সেই সময়ে আমাদের স্কুলের এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে ছিনতাইকারী ও ডাকাতদের আনাগোনা থাকত।’ স্কুল থেকে একা বেরও হওয়া নিষেধ ছিল। সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়, রাগ আরও বাড়ে। তখন রিকশার বেল শোনা যায়। দারোয়ান জানালেন, কেউ নিতে এসেছে। রাগে তৌসিফ দ্রুত বেরিয়ে পড়েন।

রাস্তায় দেখেন, মা এসেছেন। তৌসিফ বলেন, ‘আমি ভেবেছি বাবা বা খালু এসেছে। শুরুতে মাকে দেখে বেশ অবাক হই। কারণ, ওই সময় মায়ের আসার কথা না। যাই হোক তখনো প্রচণ্ড রাগ মনে। কোনো কিছু না ভেবেই মায়ের ওপর রাগ ঝাড়তে শুরু করে দিলাম। আমি একের পর এক রেগেই চলেছি। মা চুপচাপ আমার দিকে ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ রিকশাওয়ালা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার মায়ের পেটে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরেছে। যা ছিল সব নিয়ে গেছে। তাঁর শরীরের অবস্থা ভালো না।”’

তৌসিফ তখনই লক্ষ করেন, মায়ের শরীর রক্তে ভেজা। মন খারাপ হয়ে যায়। রিকশাচালক সাহায্য চাইছেন, কিন্তু পরিচিত হলেও ভয়ে কথা গুছাতে পারছেন না। অনেকে ভয় পেয়ে সরে যাচ্ছে। তৌসিফ বলেন, ‘রক্তাক্ত মাকে দেখে আমি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম। সাহায্য চাইলাম। আমি তো ছোট, কীভাবে হাসপাতালে নেব জানি না। কিন্তু কেউ এগিয়ে না আসায় একসময় আমার নিজেরই মনে পড়ে গেল হাসপাতালের রাস্তার কথা। দুই বছর আগে ইবনে সিনায় আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয়। যে কারণে আমি রাস্তাটা চিনতাম। পরে রিকশাচালককে বললাম, আমি যেদিকে বলব সেদিকে যাবেন।’

মাকে জড়িয়ে রিকশায় ওঠেন তৌসিফ, রাস্তা দেখিয়ে দেন। ‘আমরা তখন ধানমন্ডি লেক, তাকওয়া মসজিদের গলি পার হয়ে হাসপাতালের দিকে যাই। রিকশায় বুঝতে পারি আম্মুর অবস্থা খুব বেশি ভালো না। দ্রুতই হাসপাতালে পৌঁছাই। আম্মুকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সেদিনের কথা আমার এখনো মনে আছে। হাসপাতালে যাওয়ার পরে সবাই আমাকে বাহবা দিচ্ছিলেন। মূলত একাই আম্মুকে হাসপাতালে আনার জন্য তারা আমার অনেক প্রশংসা করছিলেন।’ পরে বাবাকে ফোন দেন। সবাই ছুটে আসেন। মাকে ১৫ দিন হাসপাতালে রাখা হয়।

তৌসিফ বললেন, ‘মায়ের কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে শেষে গলার চেইন টান দেয় ছিনতাইকারী। কিন্তু সেটা নিতে পারে নাই। যে কারণে ছিনতাইকারীরা হাতের টিপ চাকু মায়ের পেটে ঢুকিয়ে দেয়। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে। মায়ের জন্য মন খারাপ লাগে।’ এই ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। মায়ের ত্যাগ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তৌসিফ বলেন, ‘এখনো প্রায়ই আমাকে ঘটনাটি ভাবায়, মা রক্তাক্ত অবস্থায়ও কাউকে সাহায্যের জন্য না ডেকে, কোনো হাসপাতালে না গিয়ে বরং আমার স্কুলে চলে এসেছিলেন, আমাকে নিতে। নিজের কথা না ভেবে মা ছেলের কথা ভেবেছিলেন। এটাই আমার মা। আমার ছোটবেলা থেকে এমন অসংখ্য ত্যাগের, যত্নের, ভালোবাসার ছোট ছোট গল্প আছে আমার মাকে ঘিরে। আমার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অবদানের ফলেই আমি আজ তৌসিফ হয়ে উঠেছি। আমি জানি না এসবের প্রতিদান কীভাবে দেব, তবে আমি এটুকু জানি মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।’

সবশেষে তৌসিফ বললেন, ‘এখনো সেই ধানমন্ডির রাস্তা সন্ধ্যার পর সুনসান নীরব হয়ে যায়। এখনো শুনি ছিনতাই হয়। এটা ভেবে খারাপ লাগে। আজ মা দিবসে পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক। আমার মায়ের মতো পরিস্থিতিতে যেন আর কোনো মাকে পড়তে না হয়। মাকে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরেছিল সেই ভয়ংকর দিনের কথা ভাবলে শরীর শিউরে ওঠে।’