গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি সুনসান বাড়ি থেকে গৃহবধূসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর থেকে গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া (৪০) পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। পুলিশ তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে তিনি সন্তানদের নিয়ে বাড়ির পাশের দোকান থেকে চকলেট ও চিপস কিনেছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের স্থানীয় বাড়ির পাশেই আবদুর রশিদের ছোট দোকান। সেখানে তিনি চা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করেন। রোববার দুপুর ১২টায় দোকানে বসে আবদুর রশিদ বলেন, গতকাল শনিবার ভোরে পাঁচজনের লাশ পাওয়া যায়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে ছোট মেয়ে মোসা. ফারিয়াকে কোলে নিয়ে ও উম্মে হাবিবার হাত ধরে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া দোকানে আসেন। বাচ্চাদের জন্য চকলেট, চিপস কিনে নেন।
‘বুহির মাইধ্যি সব চাপা দিয়া রাখতিরে মা, আমারে কইশনাই রে’—নিহত শারমিনের বাবার আহাজারি।
আবদুর রশিদ জানান, রাত ১০টার মধ্যে তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। তাই এর পরের কোনো ঘটনা তাঁর জানা নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘সন্তান মা-বাবার কাছে ঘরেই যদি নিরাপদ না থাকে, তাইলে আর কই নিরাপত্তা পাইব।’
বেলা দেড়টার দিকে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা বাড়িতে আসে। আশপাশের উৎসুক বাসিন্দারাও ঘুরে দেখছিলেন। স্থানীয় লোকজন জানান, সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফরেনসিক বিভাগের সদস্যরা সেখানে এসে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে যান। এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এই ঘটনা দেশের মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একজন বাবা কীভাবে এমন কাজ করতে পারে, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা কেমন নৃশংসতা।’
বাড়ির সামনের সড়কে স্থানীয় মোসা. শ্রাবণী বলেন, ‘এই ঘটনা একা কেউ ঘটিয়েছে বলে মনে হয় না। আমি খবর শুনে ঘরের ভিতর গিয়ে বীভৎস পরিস্থিতি দেখেছি। একটি ঘরে বিছানার পাশে জানালার গ্রিলে শারমিন আক্তারকে দুই হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। শরীরে নতুন শাড়ি। মুখে টেপ প্যাঁচানো, মুখের বেশির ভাগ কালো কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো, পিঠের পেছনে দেয়ালে রক্তের দাগ। আমার জীবনে এমন হত্যাকাণ্ড দেখিনি কখনো।’
ভাইকে কল করে গৃহকর্তা বলেন, ‘সবাইকে মাইরা ফেলছি, আমারে আর পাবি না’।
স্থানীয় মোসা. নূর বলেন, ‘এ ঘটনার পর আমরা নিজেরা ভয়ে আছি, আতঙ্কে আছি। বাবা নিজের তিন সন্তানকে তো মেরেছেনই, নিজের ওয়াইফকেও মেরেছেন। এটা তো কল্পনাও করা যায় না। অপরাধী যেখানেই থাকুক, তাঁকে ধরে এনে বিচার করা হোক। স্বামীর কাছে যদি স্ত্রী-সন্তান নিরাপদ না থাকে, তাহলে আর কোথায় নিরাপদ থাকবে। বাবার পরে স্বামীই একজন নারীর আশ্রয়স্থল। এটার যদি বিচার না হয়, তাহলে দেশে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’
গত শনিবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামের এক বাড়ি থেকে এক নারী, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ভাইয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে নারীর স্বামী পলাতক। পুলিশের ধারণা, স্বামীই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
নিহতরা হলেন গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর মেয়েরা মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) ও ভাই রসুল মিয়া (২২)। হত্যাকাণ্ডের জন্য শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া (৪০)-কে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের মেরি গোপীনাথপুর গ্রামে। ফোরকান প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে কাপাসিয়ার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তিনি প্রাইভেট কার চালাতেন। শ্যালক রসুল মিয়া গাজীপুর সদরের এক কারখানায় কাজ করতেন।
নিহত শারমিনের ফুফু ইভা আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ফোরকান তাঁর ভাই মিশকাতকে কল দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’ খবর পেয়ে তারা পাঁচ-ছয়জন সকালে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে দেখেন, ভবনের কলাপসিবল গেট খোলা। নিচতলার কক্ষগুলোর দরজাও খোলা। ভিতরে পাঁচজনের নিথর দেহ পড়ে আছে। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানানো হয়। একই সঙ্গে তারা কাপাসিয়া থানায় যান।
ইভা আক্তারের দাবি, ফোরকান আরেকটি বিয়ে করবেন বলে শারমিনকে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে শারমিন মনঃক্ষুন্ন ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। ছয়-সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে মারধর করেন। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সুস্থ হওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। কয়েক দিন পর ফোরকান স্ত্রীকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। তবে দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ চলছিল। শারমিন স্বামীকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সন্তানদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান।
লাশগুলোর পাশ থেকে গোপালগঞ্জ সদর থানা বরাবর করা একটি অভিযোগের মতো কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এতে কোনো স্বাক্ষর নেই। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা জিডি তাঁর থানায় হয়নি।
কম্পিউটারে টাইপ করা ওই কাগজ থেকে জানা যায়, ৩ মে ফোরকান মিয়া থানায় ওই অভিযোগ করেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী, শ্বশুরসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই কাগজে লেখা রয়েছে, শ্বশুর তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে কয়েক দফায় তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া স্ত্রী তাঁর এক স্বজনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় শ্বশুর ও অন্যরা মিলে তাঁকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেন।
নিহত শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘আমাদের জানামতে, ফোরকান সম্প্রতি তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাননি। তাঁকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার মনে হয়, তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন অভিযোগ লিখেছেন।’
এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাপাসিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) যুবায়ের আহমেদ জানান, এখনো মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। চেষ্টা চলছে।






