পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত হবে না, বরং আইন অনুসারে কাজ করবে—এই স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬’ উদযাপনে আজ রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘কল্যাণ প্যারেডে’ তিনি এসব কথা বলেন। রুদ্ধদ্বার এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা মুক্তকণ্ঠকে তথ্য জানান।
বেলা ১১টার দিকে শুরু হয় পুলিশের কল্যাণ প্যারেড, যা বেলা ১টা পর্যন্ত চলে। অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সারা দেশ থেকে পুলিশ সদস্যরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা তাঁদের দাবি তুলে ধরেন, পরে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন স্বার্থে পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই অন্ধকার অতিবাহিত হয়েছে, এখন নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। জনগণের বিশ্বাস অর্জনই পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন আধুনিক, মানবিক ও সুদক্ষ পুলিশবাহিনী ছাড়া জনগণের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া কঠিন। সরকার এই লক্ষ্যে কাজ করছে। পুলিশের যৌক্তিক দাবি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করে তারা প্রমাণ করেছে যে নিরপেক্ষতা সম্ভব। একই সঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অতীতে দেশের মানুষ পুলিশের ভিন্ন চিত্র দেখেছে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসনে ফিরে না যায়, সেটিই হোক পুলিশ সপ্তাহের অঙ্গীকার।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও জানমালের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অতীতে দলীয় স্বার্থে পুলিশকে জনগণের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল। পুলিশের কাজ ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’। থানায় গিয়ে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, এটা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। বিপদে থাকলে থানায় গিয়ে বিপদ কমবে—এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের সঙ্গে মানবতার ছোঁয়া থাকলে জনমনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পুলিশ মাঠপর্যায়ে সরকারের ‘অ্যাম্বাসেডর’। পুলিশ কোনো দলের অনুগত হবে না, বরং আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করুন। থানাগুলো এমন গড়ুন যাতে সুপারিশ ছাড়াই অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়া যায়।
কমিউনিটি পুলিশিং ও ওপেন হাউস ডে অব্যাহত রাখুন। জনগণের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়লে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। সাইবার অপরাধ, কিশোর গ্যাং, আর্থিক জালিয়াতি, মাদক ও অনলাইন জুয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাইবার বুলিং নারীদের জন্য বড় সমস্যা। মাদক সরবরাহকারী ও উৎসকে টার্গেট করে অভিযান জরুরি। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট।
বাংলাদেশ পুলিশকে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তর করতে হবে। অপরাধ বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের প্রয়োগ দরকার। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় এআই, বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস ও সাইবার সক্ষমতা জোরদার করুন।
মানবাধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, গুম, অপহরণ বা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগে মেধা–যোগ্যতা–দক্ষতা–সততা প্রাধান্য দিন। পুলিশ সদস্যদের আবাসন, চিকিৎসা, রেশন ও ঝুঁকি ভাতা বাড়ানোর বিষয় সক্রিয় বিবেচনায় আছে।
দুর্নীতি, দুঃশাসন, দুর্বল শাসনকাঠামো, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা ও ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব প্রত্যাশা অল্প সময়ে পূরণ সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, অস্ত্রের চেয়ে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাই বড় শক্তি। সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির স্বাগত বক্তব্য দেন। পুলিশ সদস্যরা দাবি তুলে ধরেন। সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দেন। শেষে অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান পুলিশ সপ্তাহের কেক কাটেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।






