চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে জাপানের জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং। তাদের হিসাবে, ১ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব। এই প্রস্তাবটি সম্প্রতি জমা পড়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে এ ধরনের প্রস্তাব নতুন নয়। গত এক দশকে দেশি-বিদেশি অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু কোনোটিই বাস্তবে পরিণত হয়নি।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক প্রস্তাব দিলেও পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এছাড়া জমির অভাব, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দেরি এবং পরিবেশদূষণের আশঙ্কা প্রকল্পগুলোর পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।
আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রকল্পের জন্য সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এগুলো চলবে, তাও স্পষ্ট নয়। একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার জড়িত থাকায় অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রী হয়ে পড়ে।
এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২৫-২৬ টাকা পড়ে, সেখানে সরকার গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনছে প্রায় ১২ টাকায়। ফলে এই ধরনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে তেমন লাভজনক নয়।মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চট্টগ্রাম নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা দরকার যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এতে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) চাপও হ্রাস পাবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, নগরে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে তারা ২ হাজার ২৬৯ টন সংগ্রহ করে।
এক দশকে ২০ প্রস্তাব
বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পে প্রস্তাব দিয়েছিল। পিপিপি ভিত্তিতে এটি চালাতে চেয়েছিল দুই প্রতিষ্ঠান। সিটি করপোরেশন এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও অনুমোদন পায়নি এখনও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) ওপর চাপ কমবে।
২০২৩ সালের জুনে সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি ৩০-৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তাব দেয়। চর বাকলিয়ায় ৩৫ একর জমির জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও পরিবেশদূষণের ভয়ে তা বাতিল হয়।
২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর পাওয়ার চায়না ১০ একর জমি ও দেড় হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য চেয়েছিল। কিন্তু সেটিও এগোয়নি।
এ ছাড়া ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড, টেকনিস রিউনিডাস আলফানার অ্যান্ড সিইইজি ইম্প্যাক্ট এনার্জি, স্যাটারাম ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-জয়েন্ট ভেঞ্চার, অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড, গ্রিন পাওয়ার লিমিটেড, সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি, স্কলার্স পাওয়ার লিমিটেড, ডঙ্গুয়ান কিউই রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডসহ লিড অ্যান্ড ইপিসি পার্টনার, এসডিআইসি পাওয়ার হোল্ডিং কোং লিমিটেড, এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড, সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, কনসোর্টিয়াম অব সিএনটিআই এলওয়াইজেড, নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড, গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক এবং কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড প্রস্তাব দিয়েছে। তারা ৬ থেকে ৩৫ একর জমি ও এক থেকে আড়াই হাজার টন বর্জ্য চেয়েছিল।
সম্ভাবনা আছে, বলছে সমীক্ষা
জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং জাপান সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাহায্যে চট্টগ্রামের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে সমীক্ষা করেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এর তথ্য সিটি করপোরেশনের কাছে উপস্থাপন করা হয়।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নগরের এক হাজার টন বর্জ্য দিয়ে ১২-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব। এটি জাতীয় গ্রিডে যাবে। প্রকল্প হলে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ৭০-৯০ শতাংশ কমবে, ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়বে এবং পরিবেশদূষণ কমবে। সমীক্ষায় এটি লাভজনক বলা হয়েছে।
যে কারণে আটকে যাচ্ছে প্রস্তাব
অতীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও পিডিবি উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর পিডিবি’র সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়। সিটি করপোরেশন আড়াই হাজার টন বর্জ্য ও বিনামূল্যে জমি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ মেগাওয়াটের জন্য ২৫ একর জমি না দিতে পারায় থেমে যায়।
সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২৫-২৬ টাকা পড়ে, সেখানে সরকার গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনছে প্রায় ১২ টাকায়। ফলে এ ধরনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে তেমন লাভজনক নয়। তিনি বলেন, এ ছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যুক্ত থাকায় পুরো প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করা প্রকৌশলী গোলাম সারওয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবগুলো অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত। সুনির্দিষ্ট ও পরিপূর্ণ প্রস্তাব না পাওয়ায় প্রকল্প আটকে আছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী দেলওয়ার হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে। আর প্রথমে বিদেশি অর্থায়নে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি সফল হয়, তাহলে সরকার তা চালু রাখতে পারে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অবশ্যই সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।






