হাতের ছোট আয়নায় নিজেকে দেখছেন ৩০ বছর বয়সী এক মা। কখনো প্রতিচ্ছবির সঙ্গে কথা বলছেন, পরক্ষণেই অভিমান করে আবার হেসে উঠছেন। যেন নিজের কোলের সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। এই মায়ের গর্ভের সন্তান সুস্থভাবে পৃথিবীতে এলেও তিনি পাননি মাতৃত্বের সুখ। মা হতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তিনি। এখন মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ মানুষগুলোর সঙ্গে কাটে তাঁর দিবানিশি।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি গ্রামে নির্জন পরিবেশে গড়ে উঠেছে ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’। আশ্রয়হীন মানুষের শেষ আশ্রয় হিসেবে এই বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলেছেন সাইফুল মালেক। তাঁকে সবাই আব্দুল মালেক বা মালেক ভাই নামে চেনেন। একসময় ঢাকায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা মালেক জেলার ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের গজন্দর গ্রামের বাসিন্দা হলেও ভালুকায় এই বৃদ্ধাশ্রম স্থাপন করেছেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়কপাশে বা হাসপাতালে পরিচয়হীন অবস্থায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন মায়েদের এখানে এনে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করার চেষ্টা চলে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বৃদ্ধাশ্রমে এখন ২২ জন বৃদ্ধ নারী ও ৫ জন বৃদ্ধ পুরুষ আছেন, সবাই পরিচয়হীন। এ পর্যন্ত ৫৭ জন এসেছেন, যাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঠিকানা পাওয়া গেলে ১৩ জন পরিবারে ফিরেছেন।
সম্প্রতি হবিরবাড়ি গ্রামের বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দেখা গেছে, এক কিশোরী ও এক তরুণী বৃদ্ধদের সেবা করছেন। রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত আরেক নারী ও দুজন পুরুষ। তদারকি করছেন আব্দুল মালেক। সবাইকে গোসল করিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসানো হয়েছে। সারিবদ্ধ হয়ে বসলেও কেউ চুপচাপ, কেউ নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁরা কেউ রাস্তায় পড়ে ছিলেন, কেউ সরকারি হাসপাতাল থেকে এসেছেন। তাঁদের পরিচয় কেউ জানে না। এই নারীরা কারও মা, পুরুষেরা কারও বাবা। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে আজ তাঁরা সন্তানের খবর জানেন না।
প্রায় চার বছর আগে ত্রিশাল থেকে রিপা আক্তার (৩০) নামের এক নারীকে আনা হয়। তাঁর গল্প তুলে ধরেন আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, ‘এই মেয়েটি মা হয়েছে; কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ পায়নি। এখন সব সময় নিজেকে আয়নায় দেখে ছায়ার সঙ্গে কথা বলে, হাসে, কখনো অভিমান করেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ওই অবস্থায় স্বামী শিশুসন্তানকে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘মেয়েটি জনমদুঃখী। কারণ, সে যখন তার মার পেটে ছিল, তখন তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সে জন্ম হওয়ার তিন বছর পর তার মা অন্য জায়গায় বিয়ে করেন। বড় হয়েছে নানির বাড়িতে। অল্প বয়সে মামারা তার বিয়ে দেন। কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারালে মামার বাড়ির জঙ্গলের ঝুপড়ি ঘরে রাখা হতো।’
বৃদ্ধাশ্রমের মায়েরা তাঁদের সন্তানের খবর জানেন না, নিজেদের পরিচয়ও বলতে পারেন না। সন্তানের কথায় কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদেন। ষাটোর্ধ্ব অষ্টমী রানীকে দুই বছর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনা হয়। তাঁর বাঁ পা ভাঙা ও পচন ধরেছিল। দীর্ঘ শুশ্রূষায় এখন তিনি হাঁটতে পারেন। স্বামী-সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি কিছু বলতে পারেন না। তবে বলেন, ‘এখানে খুব ভালো আছি।’
যশোদা বর্মণের বয়স প্রায় ৭০। প্রায় ৫ বছর আগে ভালুকা পৌর এলাকার এক মন্দিরপাশ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে আনা হয়। এখন তিনি নিজে চলাফেরা করেন। বাড়ি টাঙ্গাইলের সখীপুর। তিনি বলেন, ‘স্বামী-সন্তান সবাই মইরা গেছে। একটা ভাই ছিল, সেটাও মারা গেছে, এখন আমার থাকার মতো কেউ নাই। এখানে অনেক ভালো আছি।’
আয়েশা আক্তারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রায় সাত বছর আগে এখানে আনা হয়। তারপর তাঁকে সারিয়ে তোলা হয়। স্বামী-সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘জামাই বেড়াইতে গেছে বাড়িতে। আর আসে না, সেখানেই রয়ে গেছে।’ এ কথা বলেই হেসে ওঠেন তিনি।
বৃদ্ধাশ্রমের সূচনা থেকে কাজ করছেন ২৪ বছর বয়সী জেরিন আক্তার (রিয়া)। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর ঢাকায় পথে বেড়ে উঠেছেন। আব্দুল মালেক তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে আশ্রয় দিয়েছেন। এখন বিয়ে করে সংসার চালাচ্ছেন। জেরিন বলেন, ‘এখানে থাকা বৃদ্ধ মানুষগুলোকে গোসল করাই, খাবার দিই এবং তাদের প্রস্রাব-পায়খানা সবকিছু পরিষ্কার করি। আমার মা নেই। বৃদ্ধ মানুষগুলোকেই মা-বাবা মনে করে সেবা করি। এতে আমার কোনো কষ্ট হয় না।’
আব্দুল মালেক বেসরকারি সংস্থার কর্মী ছিলেন। গাজীপুরে কাজ করতেন। চাকরির পাশাপাশি ফেরি করে যষ্টিমধু বিক্রি করতেন। ২০০৯ সালে পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। ঢাকায় পথশিশুদের সঙ্গে কাজ করার সময় রেলস্টেশনে মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধদের দেখে মন বিচলিত হয়। দেশে এমনদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম কম থাকায় তিনি পরিকল্পনা করেন। ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত অর্থায়নে ভাড়া বাড়িতে কাজ শুরু করেন।
আব্দুল মালেক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ভাড়া বাড়িতে তিন বছর পর আমি প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ী করার জন্য জমি খুঁজতে শুরু করি। তখন বেসরকারি একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদ সাহেব আমার কার্যক্রম দেখে বৃদ্ধাশ্রমের জন্য ২ একর জমি দান করেন। তারপর আমরা তাঁকে পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান করে কার্যক্রম চালাতে শুরু করি। এখন সেই জমিতে পাঁচতলা ভিতের ওপর একতলা ভবনে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে। আমরা ধীরে ধীরে এটি সম্প্রসারণ করব এবং আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়াব।’
মালেক আরও বলেন, ‘সাধারণত আমরা নিজেরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি। অনেক সময় বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বিভিন্ন হাসপাতাল, সমাজসেবা কার্যালয় ও থানা থেকে পাঠায়। এখানে আসার পর তাঁদের চিকিৎসা করা হয়। তাঁরা যখন রাস্তায় পড়ে থাকেন, তখন শরীরে পচন ধরে যায়, সেগুলো সারিয়ে তোলা হয়।’ তিনি বলেন, ‘পরিচালনার জন্য আমরা মানুষের কাছ থেকে কোনো টাকা নিই না। আমাদের চার সদস্যের পরিচালনা কমিটির অর্থায়নেই এটি পরিচালিত হচ্ছে। নিজের বাবা-মা কল্পনা করে এসব মানুষের সেবা করতে পারছি—জীবনে এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি।’
ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মন্ডল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যেসব মানুষ অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকেন, তাঁদের উদ্ধার করে পারিবারিক পরিবেশে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। কেন্দ্রটির এই মহতী কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক। সমাজসেবা অধিদপ্তর সর্বদা তাঁদের পাশে আছে।






