কয়েক মাস ধরে দুই চোখ থেকে পানি ঝরছে সামসুন্নাহারের (৬৫)। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর বিয়ে করেননি। বড় ভাইয়ের পরিবারেই থাকেন। কোনো সন্তান নেই। বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসার ক্যাম্পের খবর শুনে তিনি উপস্থিত হন। সেবা নিয়ে ফেরার পথে সামসুন্নাহার বলেন, ‘কয়েক মাস দুই চোখে খুব জ্বালাযন্ত্রণা করছে। ড্রপ দিয়েও কাজ হচ্ছে না। ডাক্তার দুই চোখ পরীক্ষার পর ওষুধ লিখে দিয়েছেন। ওষুধও ফ্রি পেয়েছি।’
ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালের ঐতিহ্যবাহী মিয়াবাড়িতে এই বিনা মূল্যের চক্ষু ক্যাম্প আয়োজিত হয়। আজ শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিয়াবাড়ির দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ ক্যাম্পে চার শতাধিক মানুষ বিনা খরচে সেবা গ্রহণ করেন। কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনায় ছিল ডিস্ট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল (ডিসিআই) নামক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় পরিদর্শনে দেখা যায়, ক্যাম্পে প্রবেশ করে সেবাপ্রার্থীরা ক্রমিক নম্বর পেয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে যাচ্ছেন। সেখানে টেকনিশিয়ান ও রিফ্রেকশনিস্টরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তারপর চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। সেই ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে সবাই বিনা মূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করছেন।
ক্যাম্পের সার্বিক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন রাজধানীর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির। এসব সেবা দেন ঢাকা প্রোগ্রেসিভ লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের নরসিংদীর চিকিৎসা কর্মকর্তা ফারজানা শাহীনসহ আট সদস্যের একটি দল।
চক্ষু ক্যাম্পে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম ব্যবস্থাপক মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও জ্যেষ্ঠ নির্বাহী খালিদ জামিল, ডিসিআইয়ের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জামাল আবদুল নাসের ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক আতিকুল ইসলাম এবং এসকেএফের সহকারী বিপণন কর্মকর্তা সেলিম মিয়াজী, আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. জহুরুল হক।
আয়োজকেরা জানান, ক্যাম্পের খবর জানাতে দুই দিন আগে থেকে স্থানীয়ভাবে মাইকিং করা হয়েছে। এতে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। চার শতাধিক রোগী সেবা নেন। চশমার সমস্যায় আক্রান্তরা ছিলেন বেশি। এছাড়া মাথাব্যথা, চোখব্যথা বা চোখে পানি পড়ার সমস্যায় অনেকে ছিলেন। কিছু নেত্রনালির সমস্যায় ভুগছিলেন। ছানি পড়া রোগীদের মধ্যে ৫০ জনকে বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে।
ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানান সালমা বেগম (৪৫)। তিনি বলেন, ‘এখানে টাকা ছাড়াই চিকিৎসাও করাতে পারছি। আবার ওষুধও দিয়ে দিছে। খুব উপকার হইল।’
২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষ। দুই বন্ধুকে ছেড়ে আসতে অস্বীকৃতি জানানোয় জঙ্গিদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন ফারাজ আইয়াজ হোসেন। সাহসী এই তরুণের নামে ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন গড়েছে তাঁর পরিবার। ফাউন্ডেশন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্যসহায়তা প্রদান, হতদরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ প্রদানসহ সারা দেশে নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।






