চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদে গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমি আক্তারের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তার মাথার ভেতর থেকে গুলিটি বের করা যায়নি। আজ শনিবার সকালে মেডিক্যাল বোর্ড বসলেও অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়নি।
আজ শনিবার বিকেলে ফয়সাল আহমেদ কয়েকবার থেমে এ কথাগুলো বলেন। তিনি মুঠোফোনে কথা বলার সময় জানান, তার বোন রেশমি আক্তার (১১) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি। গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের রৌফাবাদ এলাকার বাঁশবাড়িয়া বিহারির কলোনিতে সে গুলিবিদ্ধ হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদে বোনের বাসায় বেড়াতে এসে দুর্বৃত্তের গুলিতে হাসান রাজু (২৪) নিহত হন। পাঁচ-ছয়জন যুবক মুখে মাস্ক পরে এসে রাজুকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই রাজুর মৃত্যু হয়। রাজুকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয় রেশমি আক্তার।
ওই রাতেই পরিবারের সদস্যরা রেশমিকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। প্রথমে তাকে নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে আইসিইউ না পেয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। আইসিইউ খালি হলে আবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গতকাল শুক্রবার রাত থেকে সেখানে আইসিইউতে ভর্তি রেশমি।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রেশমির বাঁ চোখ দিয়ে গুলিটি মাথার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এটি এখনো মাথার ভেতরেই রয়েছে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। আপাতত আইসিইউতে চিকিৎসা চলছে। গুলিটি তার মাথার পেছনের অংশে আটকে আছে। এটি মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে ছেদ করে গেছে। ফলে সরাতে গেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বেশি।
আজ সকালে রেশমির শারীরিক অবস্থা নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড বসে। বোর্ডে নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাইফুল আলম, মো. সানাউল্লাহ, মাহফুজূল কাদের, মোহাম্মদ ইসমাইল, মো. ওমর ফারুক, চক্ষু বিভাগের অধ্যাপক তানুজা তানজিন, অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের অধ্যাপক কে এম বাকি বিল্লাহ ছিলেন। বোর্ডে রেশমির অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত হয়।
নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার খুরশিদ আনোয়ার বলেন, সকালে মেডিক্যাল বোর্ড বসেছিল। রেশমির মাথার ভেতরে গুলিটি এখনো রয়েছে। গুলিটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছেদ করে পেছনের দিকে আটকে আছে। এখন অস্ত্রোপচার করলে ঝুঁকি রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনো সংক্রান্তাপন্ন। চিকিৎসকেরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘রেশমির শারীরিক অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তার মাথার ভেতরে গুলিটি রয়েছে। মেডিকেল বোর্ড বিষয়টি পর্যালোচনা করে আপাতত অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
আজ বিকেলে হাসপাতালের আইসিইউর সামনে রেশমির পরিবারের সদস্যদের পাওয়া যায়নি। আশপাশের রোগীর স্বজনেরা জানান, তারা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন। পরে মুঠোফোনে ফয়সালের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, সারা রাত হাসপাতালে কাটিয়েছেন, বাসায় খাওয়া-দাওয়া করতে এসেছেন।
পরিবার সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে রেশমির মা তাকে পান আনতে পাঠিয়েছিলেন। পান নেওয়ার জন্যই সে রাস্তার দিকে যায়। তখন গোলাগুলি শুরু হয় এবং তার চোখে গুলি লাগে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রেশমি সবার ছোট। সে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা রিয়াজ আহমেদ সবজি বিক্রেতা।
রেশমির বাবা রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমার মেয়ের কোনো হুঁশ নাই। আজ আমার মেয়ের সঙ্গে এ ঘটনা হয়েছে, কাল অন্য কারও সঙ্গেও হতে পারে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের শাস্তি চাই আমি। প্রশাসন ও সরকার এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলে মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। এখনো আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
গতকাল শুক্রবার রাতে রেশমিকে দেখতে হাসপাতালে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’






