দেশে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি। দেশীয় উদ্যোক্তারা এসব কারখানায় বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু আমদানিতে কম শুল্ক-কর এবং নতুন সুবিধার কারণে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

কাঠবাদাম ও আখরোটের মতো পণ্য দেশে উৎপাদন হয় না, পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যে আমদানিকারকদের মোট শুল্ক-কর দিতে হয় ৬২ শতাংশ। তার বিপরীতে কাজুবাদাম আমদানিতে সব মিলিয়ে ৪৬ শতাংশ শুল্ক-কর। এই শুল্কবৈষম্যের মধ্যেও দেশীয় উদ্যোক্তারা এতদিন উৎপাদন চালিয়ে যান। কিন্তু নতুন করে আমদানিতে সুবিধা বাড়ায় তারা এখন চাপে পড়েছেন।

নতুন সুবিধা অনুযায়ী, হালকা আবরণযুক্ত আমদানিকৃত কাজুবাদামের কেজিপ্রতি ১০১ টাকা শুল্ক-কর ছাড়। কাস্টমস শুল্কায়ন মূল্য কমিয়ে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে আমদানিকারকরা লাভবান হচ্ছেন। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, এই সুবিধায় আমদানির খরচ আরও কমছে, যেখানে দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণে খরচ বেশি। ফলে হালকা আবরণযুক্ত কাজুবাদাম আমদানি বেড়েছে, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কমেছে।

এক দশক আগে পার্বত্য অঞ্চলের উৎপাদিত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত করে এই শিল্প শুরু করেন উদ্যোক্তা শাকিল আহমেদ তানভীর। কিন্তু মূল্য কারসাজির কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ২০২২ সালে তার দেশের প্রথম কারখানাটি বন্ধ হয়। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মূল্য কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করলে পরিস্থিতি উন্নত হয়। ২০২২ সালে কাঁচা কাজুবাদাম কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, গত বছর তা ১৬০ টাকায় উঠে। তবে চলতি মাসে ফলন শুরু হলেও পার্বত্য এলাকায় দাম গতবারের চেয়ে কম।

বান্দরবানের রুমা এলাকার কৃষক ইউ থোয়াই মং মারমা ও মং বোয়াং মারমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গতবার প্রতি মণ কাজুবাদাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার পাঁচ হাজারের বেশি দর উঠছে না।” কারখানার উদ্যোক্তারা আগে কাজুবাদাম সংগ্রহে উৎসাহী ছিলেন, এবার চাহিদা কম। আমদানি বেড়ে দেশীয় উৎপাদিত কাজুবাদামের চাহিদা কমেছে।

শিল্পের সম্ভাবনা দেখে বড় গোষ্ঠীও আগ্রহী হয়। ইস্পাত খাতের শীর্ষ গোষ্ঠী বিএসআরএম গ্রুপ ২০২৩ সালে চট্টগ্রামের নাছিরাবাদে কারখানা চালু করে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। কাজী ফার্মস গ্রুপও একই অঞ্চলে ১৮১ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে। কিন্তু আমদানির নতুন সুবিধায় এসব উদ্যোগ থমকে গেছে।

আমদানিতে বাড়তি সুবিধা

তিন বছর আগে কাজুবাদামের শুল্কায়ন মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ১ দশমিক ৮৫ মার্কিন ডলার, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম প্রায় ৬ ডলার। ২০২৩ সালে এটি ৬ ডলারে উন্নীত হয়। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘হালকা আবরণযুক্ত’ কাজুবাদাম আমদানি শুরু হয়, শুল্কায়ন মূল্য ৪ দশমিক ১০ ডলার। এতে কেজিপ্রতি ১০১-১০৭ টাকা করছাড়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, হালকা আবরণযুক্ত কাজুবাদাম এনে দেশে কিছুটা প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। তাই মধ্যবর্তী কাঁচামাল হিসেবে শুল্কায়ন মূল্য কম। এনবিআর-এর সুবিধায় আমদানির ধরন বদলে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ধরনের আমদানি শূন্য ছিল। ২০২৪-২৫-এ মোট আমদানির ৪৮ শতাংশ হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে ৮৭ শতাংশ।

উৎপাদন খরচ বেশি, বাজারদর কম

দেশীয় কারখানাগুলো খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে। এতে বাষ্পে সেদ্ধ, শুকানো, খোসা ছাড়ানোসহ জটিল ধাপ। পাঁচ কেজি কাঁচা থেকে এক কেজি খাওয়ার উপযোগী বাদাম, তাতে ৩০ শতাংশ ভাঙা। মোট খরচ ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ২৮০ টাকা। কিন্তু বাজারদর ভাঙাসহ ১ হাজার ১০০ থেকে ১৪০ টাকা।

আমদানিকৃত কাজুবাদামের খরচ প্রায় ১ হাজার ১৬০ টাকা, বিক্রি ১ হাজার ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। হালকা আবরণযুক্তের খরচ আরও কম, মুনাফা বেশি।

শিল্পে টানাপোড়েন

‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাশু প্রসেসর (প্রস্তাবিত)’–এর হিসাবে, দেশে ২০টি কারখানা। কয়েকটি খরচ পোষাতে না পেরে বন্ধ, বাকি অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। সভাপতি মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান বলেন, “বিশ্ববাজারে কাজুবাদামের মূল্য সাত থেকে আট ডলার হলেও বাংলাদেশে আমদানিতে শুল্কায়ন হচ্ছে ছয় ডলারে। আবার স্থলবন্দরগুলোয় সব চালানই কেজিপ্রতি ৪ দশমিক ১০ ডলারে শুল্কায়ন করা হচ্ছে।” তাঁর মতে, আমদানিতে মূল্য কারসাজির কারণে দেশীয় শিল্প টিকছে না। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় এই কারসাজি বন্ধ জরুরি।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, নীতিগত বৈষম্য চলতে থাকলে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্প আবার আমদানিনির্ভরতার দিকে ফিরবে।