মুক্তির এক মাস অতিক্রান্ত হলেও বিশ্বব্যাপী ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ নিয়ে উত্তেজনা এখনও জমজমাট। ২৪৮ মিলিয়ন বাজেটের এই সিনেমা এখন পর্যন্ত ৬৪১ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। চলতি বছরের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রে এটি স্থান পেয়েছে। ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলারের এই সাই-ফাই সিনেমাকে ‘স্লিপার হিট’ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ শুরুতে তেমন আলোচিত না হলেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এটি। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া ভালো লাগাই এর মূল কারণ। অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজের ব্যানারে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি স্টুডিওর সবচেয়ে বেশি আয়কারী চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাস রচন করেছে। রায়ান গসলিং অভিনীত এই সিনেমায় কী এমন আছে যা বিশ্বদর্শক পছন্দ করছেন?
একনজরে
সিনেমা: ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’
ধরন: সায়েন্স ফিকশন
পরিচালনা: ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার
অভিনয়: রায়ান গসলিং, সান্ড্রা হুলার, লায়নেল বয়েস
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট
সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, মহাকাশযানে হঠাৎ ঘুম ভেঙে জাগেন গ্রেস (রায়ান গসলিং)। হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন তিনি। পটভূমিতে রোবটের কণ্ঠ ভেসে আসে যে তিনি সাময়িকভাবে স্মৃতি হারিয়েছেন। এরপর তিনি মহাকাশযানে আসার কারণ খুঁজতে শুরু করেন।
অসরলরৈখিক বর্ণনায় এগোয় গল্প। এর বড় অংশে খুলে যায় গ্রেসের মহাকাশযাত্রার কারণ। অতীত খোঁজার সময় ফ্ল্যাশব্যাকে উঠে আসে পৃথিবীর করুণ চিত্র। একসময়ের মলিকুলার বায়োলজিস্ট গ্রেস আসলে হাইস্কুল শিক্ষক।
তাঁর একটি থিওরি দেখে রহস্যময়ী নারী ইভা (সান্ড্রা হুলার) গ্রেসকে নিয়োগ দেন। কারণ, সূর্যের ভিতর অজানা সংক্রমণ ‘অ্যাস্ট্রোফেজ’ ছড়িয়েছে। এতে সূর্যের আলো কমছে, ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে সূর্য। কয়েক বছর পর পৃথিবী থেকে জীবনের অস্তিত্ব মুছে যাবে। মানবজাতি রক্ষার শেষ চেষ্টায় নাসা ‘হেইল মেরি’ মিশন শুরু করে।
গ্রেসের সঙ্গী সহযাত্রীদুজন ইতিমধ্যে মৃত। মহাকাশযান চালানোর কোনো জ্ঞানও নেই গ্রেসের। এই অসহায়ত্বের মধ্যে গল্প নতুন মোড় নেয়। গ্রেসের সাক্ষাৎ হয় এক ভিনগ্রহের প্রাণীর সঙ্গে। গ্রেস কি সেই প্রাণীর সাহায্যে পৃথিবী বাঁচাতে পারবেন? নাকি তাঁকেও মৃত্যু আলিঙ্গন করতে হবে?
অ্যান্ডি উইয়ারের একই নামের জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিনেমা। আগে তাঁর লেখা থেকে ‘দ্য মার্শিয়ান’ও তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞান, হাস্যরস ও মানবিক টানাপোড়েনের গল্প পর্দায় তুলেছেন ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার। বইয়ের মূল কাঠামো, বিশেষ করে অসরলরৈখিক বর্ণনা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন নির্মাতারা। বর্তমান মহাকাশে গ্রেস ও অতীত পৃথিবীর গল্প ধীরে ধীরে জানা যায়। ফলে গল্পে টানটান উত্তেজনা বজায় থাকে।
এককথায়, ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ এক ‘ফিল-গুড’ মহাকাশ থ্রিলার। ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার এমন পরিচালক জুটি যাঁরা কমেডি, অ্যানিমেশন ও সাই-ফাই মিশিয়ে আধুনিক হলিউডের গল্প বলার ধরন বদলে দিয়েছেন। জাঁকজমকপূর্ণ ছবিটি বড় পর্দায় উপভোগ্য। গসলিংয়ের অভিনয়ই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি। গসলিং নিজেই জানিয়েছেন, এ ছবিতে কাজ করার অন্যতম কারণ ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ। তাঁর মতে, কঠিন বৈজ্ঞানিক কাহিনিকে সহজ করে তুলতে এই উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিজ্ঞান কেবল প্রেক্ষাপট; আসল গল্প মানবিকতার। তাই জটিল বিজ্ঞানের মধ্যেও গল্পের আবেগ অটুট থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, ছবিটি অতি দীর্ঘ (২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট), ভেতরে বৈচিত্র্যের অভাব। ‘ইন্টারস্টেলার’-এর ছায়াও স্পষ্ট।
মহাকাশের বিশাল ক্যানভাসে ছবিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। বড় ভিজ্যুয়াল দেখাতে গিয়ে উজ্জ্বল আলো, উচ্চ সুর দিয়ে দর্শককে জোর করে বিস্মিত করার চেষ্টা। ফলে মহাকাশের স্বাভাবিক বিস্ময় কিছুটা নষ্ট হয়।
ছবিটি অনেক জায়গায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ। যেমন ইভা চরিত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ কারাওকে যেখানে গাওয়া হয় ‘সাইন অব দ্য টাইমস’। গ্রেসের আবেগঘন দ্বন্দ্ব—মিশন চালিয়ে যাবেন নাকি রকিকে বাঁচাতে ফিরবেন—খুব চেনা। পূর্বনির্ধারিত আবেগ তৈরির কৌশল।
অভিনয়ে আসলে দেখা যায়, বেশিরভাগ জায়গায় একাই গ্রেস চরিত্র। রায়ান গসলিং এই চরিত্রে একাই সিনেমা টেনে নিয়ে গেছেন। একক দৃশ্যে তাঁর অভিনয় চলনসই। সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে প্রাণবন্ত। বিশেষ করে ভিনগ্রহের প্রাণী রকির সঙ্গে বন্ধুত্ব ছবির প্রাণ। কমেডির জায়গায় গসলিং দুর্দান্ত। সান্ড্রা হুলার ইভা স্ট্র্যাট চরিত্রে অল্প সময়েই নজর কেড়েছেন। পুরো মিশনের চাপ ও গুরুত্ব তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। লায়নেল বয়েসের কার্ল ছোট চরিত্র কিন্তু মজার ও মানবিক অভিনয়ে গল্পে গতি এনেছে।
চিত্রগ্রাহক গ্রেগ ফ্রেজার, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টে পল ল্যামবার্ট ও সম্পাদনায় নেগ্রন—তিনজনই ভালো কাজ করেছেন। মহাকাশের নির্জনতা, শূন্যতা ও গসলিংয়ের একাকিত্ব দারুণভাবে তুলে ধরেছেন ফ্রেজার। আলোছায়ায় গল্পের মেজাজ বোঝানো হয়েছে। পপ-রক, ফোক ও কান্ট্রির মিশেলে ড্যানিয়েল পেম্বারটনের সংগীত নস্টালজিক অনুভূতি তৈরি করেছে। হালকা গান আনন্দ দিয়েছে, গভীর নিঃসঙ্গতার আবহ তৈরি করেছে। মহাকাশের বিস্ময় ও অনিশ্চয়তা সুরে ফুটে উঠেছে।
‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ দেখে মনে হয় ফর্মুলা সিনেমা। হিসাব কষে ‘হিট’-এর উপযোগী করে তৈরি। বক্স অফিসে ঝড় তুলবে এটা আশ্চর্যজনক নয়; তবে কতদিন মনে থাকবে, বলা কঠিন।






