ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমায় বহুমাত্রিক অভিনয়ের নাম বলতে যাঁর কথা প্রথম মনে পড়ে, তিনি সুকুমারি। ছয় দশকেরও বেশি সময় বিস্তৃত তাঁর ক্যারিয়ার এক বিস্ময়কর অধ্যায়। সংখ্যায় পরিমাপ করা কঠিন হলেও হিসাব বলছে, ৬২ বছরে তিনি অভিনয় করেছেন আড়াই হাজারের বেশি সিনেমায়। প্রতিদিন একটি করে দেখলেও শেষ করতে লাগবে প্রায় এক দশক।
একঘেয়েমির বিপরীতে ব্যতিক্রম
অভিনয়ে বহুমুখিতা সহজ নয়। অনেক শিল্পীই এক ধরনের চরিত্রে আটকে যান, ইন্ডাস্ট্রির চাপে। এমনকি দক্ষিণ ভারতের পরীক্ষামূলক মালয়ালম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও এই প্রবণতা দেখা যায়।
কিন্তু সুকুমারি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি নিজেকে কখনো এক ধরনের চরিত্রে সীমাবদ্ধ করেননি। কমেডি থেকে গভীর আবেগঘন ভূমিকায় সমান স্বচ্ছন্দতায় দর্শককে মুগ্ধ করেছেন।
শৈশবেই শুরু
মাত্র ১০ বছর বয়সে বড় পর্দায় অভিষেক। ১৯৫১ সালের তামিল চলচ্চিত্র ‘অর ইরাভু’-তে প্রথম অভিনয় করেন। এক শুটিং সেটে উপস্থিত থাকায় নির্মাতার নজরে পড়েন।
মালয়ালম সিনেমাতেও প্রায় একইভাবে প্রবেশ। ১৯৫৭ সালের ‘থাসকারাভিরান’-এ এক অভিনেত্রীর অনুপস্থিতিতে হঠাৎ সুযোগ পান। নাচের দল থেকে সরাসরি ক্যামেরার সামনে আসা যেন ভাগ্যের ইশারা।
এক জীবনে অসংখ্য রূপ
নায়িকা থেকে মা—এমন বিস্তৃত পরিসর কমই দেখা যায়। সুকুমারি অভিনয় করেছেন প্রায় সব কিংবদন্তি অভিনেতার সঙ্গে, কখনো নায়িকা কখনো মা হিসেবে। পরবর্তী প্রজন্মের মোহনলাল, মামুট্টির সঙ্গেও মা, আত্মীয় বা চরিত্রাভিনেত্রী হয়ে কাজ করেছেন। কমেডিতে আদর ভাসির সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়, দুজনে মিলে তিরিশটির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন।
ভাষা ও ভূগোল পেরিয়ে
শুধু মালয়ালম নয়, তামিল, তেলেগু, হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি, এমনকি ইতালীয় ও ফরাসি ভাষার সিনেমাতেও কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের ‘প্যান-ইন্ডিয়ান’ শিল্পী, যা আজকাল প্রচলিত শব্দ কিন্তু তিনি আগেই তার উদাহরণ হয়েছিলেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। ভারত সরকার পদ্মশ্রী দিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একাধিক কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৫৯ সালে নির্মাতা এ ভিমসিংকে বিয়ে করেন। কিন্তু অল্প বয়সেই স্বামীকে হারান। এই শোক সত্ত্বেও অভিনয় থেকে সরেননি, বরং আরও বেশি কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন।
শেষ অধ্যায়
২০১৩ সালের ২৬ মার্চ চেন্নাইয়ের এক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দুর্ঘটনায় দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ভক্তরা আরও অনেকবার তাঁকে পর্দায় দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ঘটনায় সব শেষ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে






