বাংলাদেশে হাজার হাজার পরিবার নীরবে লড়াই করছে থ্যালাসেমিয়া নামক জন্মগত রক্তরোগের সঙ্গে। এই রোগে রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত সুস্থ লোহিতকণিকা তৈরি হয় না। ফলে রোগীদের প্রতি মাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত নিতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হয়।
বিশ্বের অনেক দেশে এখন থ্যালাসেমিয়া আর আগের মতো কঠিন রোগ নয়। সঠিক চিকিৎসায় রোগীরা প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন—পড়াশোনা, চাকরি乃至 পরিবার গঠনও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। মানসম্পন্ন চিকিৎসার অভাবে রোগের বিস্তার দিন দিন বাড়ছেই।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিয়মিত নিরাপদ রক্তসঞ্চালনই মূল অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কিন্তু এখানে রক্তই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার অনেক কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের লোকজনকেই রক্ত জোগাড় করতে হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে রক্তের চাহিদার ৯০ শতাংশ থেকে শতভাগ স্বেচ্ছায় দাতাদের কাছ থেকে আসে, কিন্তু আমাদের দেশে পরিসংখ্যানমতে মাত্র ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। এমনকি একই গ্রুপের রক্ত পেলেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ রক্ত পাওয়া কঠিন।
শুধু অভাব নয়, রক্তের মান নিয়েও সমস্যা। নিরাপদ রক্তসঞ্চালনের জন্য দাতা-গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ হুবহু মিলতে হবে এবং রক্ত জীবাণুমুক্ত হতে হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ স্থানে এ নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। ফলে রক্তসঞ্চালনের পর রোগসংক্রমণ, রিঅ্যাকশন বা জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এসবের ফলে অনেক রোগী কম হিমোগ্লোবিন নিয়ে দিন চালাতে বাধ্য। তাদের শরীর অস্বাভাবিক ও খর্বাকৃতি হয় এবং জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
বারবার রক্ত নেওয়ায় শরীরে আয়রন জমে যায়, যা হৃদয়, লিভার ও হরমোনের ক্ষতি করে। এর মোকাবিলায় চিলেশন ওষুধ দরকার, যা অতিরিক্ত আয়রন বের করে। কিন্তু এ ওষুধগুলো ব্যয়বহুল এবং কখনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। খরচের অভাবে অনেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না।
নতুন ওষুধ যেমন মিটাপিভাট, লুসপাটারসেপ্ট ও থ্যালিডোমাইড রক্ত নেওয়ার নির্ভরতা কমাচ্ছে। কিন্তু মিটাপিভাট ও লুসপাটারসেপ্ট অত্যন্ত দামি এবং বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। থ্যালিডোমাইড পাওয়া গেলেও সবার জন্য নিরাপদ নয়। ফলে অধিকাংশ রোগী পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, আয়রন জমা বা ডায়াবেটিস-থাইরয়েডের জটিলতা জানতে নিয়মিত পরীক্ষা দরকার। কিন্তু সব অঞ্চলে এগুলো সহজে পাওয়া যায় না। ফলে জটিলতা দেরিতে ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা সঠিকভাবে হয় না।
দেশে উন্নত চিকিৎসা মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক। গ্রামাঞ্চলের রোগীদের বারবার শহরে আসতে হয়, যাতায়াতের খরচ যোগ হয়। একদিনে রক্তসঞ্চালন ও ডাক্তার দেখানো সম্ভব না হলে হোটেল বা আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটাতে হয়।
বেশিরভাগ হাসপাতালে শুধু রক্তসঞ্চালনের সুবিধা আছে, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই—যেমন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা পরীক্ষা। এতে চিকিৎসা ব্যাহত হয়।
চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। রক্ত, ওষুধ, পরীক্ষা, যাতায়াত মিলে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ। একাধিক রোগী থাকলে আরও কঠিন। আর্থিক সংকটে অধিকাংশ রোগী পূর্ণ চিকিৎসা চালাতে পারেন না।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্ভব। বিয়ের আগে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রফোরেসিস পরীক্ষা করে দুই বাহকের বিয়ে নিরুৎসাহিত করতে হবে। গর্ভাবস্থায় প্রিন্যাটাল স্ক্রিনিং করে আক্রান্ত শিশুর জন্ম এড়ানো যায়। কিন্তু দেশে সচেতনতা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা সীমিত। সরকারি তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৮ হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।
রোগীরা শারীরিকের পাশাপাশি মানসিক-সামাজিক সমস্যায় ভোগেন। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়েতে বাধা আসে। কুসংস্কার পরিস্থিতি খারাপ করে। বাহক শনাক্ত হলে অনেকে গোপন করেন।
রোগী ও বাহক আলাদা। রোগীরা অসুস্থ, রক্ত-ওষুধ দরকার। বাহকরা সুস্থ, কোনো লক্ষণ নেই। দুই বাহকের সন্তানের ঝুঁকি থাকে, কিন্তু এক বাহক সুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে করলে পরবর্তী প্রজন্ম সুস্থ থাকবে।
সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগে পরিস্থিতি বদলানো যায়। সরকারি-বেসরকারি-ব্যক্তিগত স্তরে সবাই এগিয়ে আসুক। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ: ১. স্বেচ্ছায় রক্তদান বাড়ানো। ২. নিরাপদ রক্ত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ৩. সব জেলায় সুলভ হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রফোরেসিস পরীক্ষা চালু করা।
থ্যালাসেমিয়া একক রোগীর নয়, জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এখনই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বাস্থ্য সংকট গড়িয়ে উঠবে।
অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদ ক্লিনিক্যাল হেমাটলোজিস্ট, সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বিএসএমএমইউ)
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন।






