রাষ্ট্রের সংকট সবসময় শুধু নীতির ব্যর্থতা থেকে উদ্ভূত হয় না; অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যাখ্যার দুর্বলতা থেকেই জন্ম নেয়। রাষ্ট্র যে কাজ করে, তা যদি জনগণের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হয়, তাহলে বাস্তবতা ও জনমনের প্রতিফলনের মধ্যে গভীর বিভেদ তৈরি হয়। এই ফাঁকটিই রাজনৈতিক যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা।

আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; সিদ্ধান্তগুলো জনগণের কাছে কীভাবে পৌঁছে তাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের কার্যকারিতা দুই স্তরে প্রকাশ পায়—একটি বাস্তব শাসন, অন্যটি জনগণের উপলব্ধি।

যখন এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্রের প্রকৃত অর্জনও জনগণের চোখে ব্যর্থতা হিসেবে মনে হতে পারে।

এই পরিস্থিতি বোঝাতে ইনফরমেশনাল ফ্লো থিউরি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানে রাষ্ট্রীয় তথ্য তিন স্তরে প্রবাহিত হয়। প্রথমত, নীতিনির্ধারণ স্তর, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ স্তর, যেখানে সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা হয়। তৃতীয়ত, গ্রহণ স্তর, যেখানে জনগণ তা উপলব্ধি করে। সাধারণত সংকটের জন্ম হয় দ্বিতীয় স্তরে, অর্থাৎ যোগাযোগের দুর্বলতায়, যা পুরো তথ্যপ্রবাহ ভেঙে দেয়।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নির্ধারণ করে জনগণ কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে। সরকার যদি এই এজেন্ডা নির্মাণে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সেই শূন্যতা পূরণ করে।

কোনো ঘটনার অর্থ কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; এটি কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, তাই জনমনে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে। একই নীতি একপাশে সংস্কার হিসেবে দেখানো যায়, অন্যপাশে ব্যর্থতা হিসেবে। যে ফ্রেমটি শক্তিশালী হয়, সেটিই সামাজিক সত্যে রূপ নেয়।

যখন সরকার তার ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতা হারায়, তখন ময়দান বিরোধী দলের। বিরোধী শক্তি নিজেদের মতো করে সরকারের কাজের অর্থ তৈরি করে দেয়। যার সারকথা হলো, সরকার ব্যর্থ, নীতি অকার্যকর, জনগণ বঞ্চিত। ধীরে ধীরে এই ব্যাখ্যাগুলোই সাধারণ বোধ বা কমন সেন্সে পরিণত হয়। অর্থাৎ যে পক্ষ বাস্তবতার অর্থ নির্ধারণ করতে পারে, সেই পক্ষই আদর্শগতভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

সরকার যখন সঠিক যোগাযোগে ব্যর্থ হয়, তখন ন্যারেটিভ ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়। এই শূন্যতা বিরোধী শক্তি সহজ, আবেগপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ভাষায় পূরণ করে। সাধারণ মানুষ জটিল নীতি বিশ্লেষণ করে না; তারা গল্প, অনুভূতি ও সরল ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাস্তবতা গ্রহণ করে। ফলে যুক্তির চেয়ে অনুভূতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

আন্তোনিও গ্রামসি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র কেবল জোর খাটিয়ে টেকে না; সম্মতি তৈরিও ততটাই জরুরি। রাষ্ট্রের দুটি স্তর আছে—রাজনৈতিক সমাজ, যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আইন কাজ করে; এবং সিভিল সমাজ, যেখানে মিডিয়া, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান জনমন গঠন করে। দ্বিতীয় স্তরের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রথম স্তরের ক্ষমতা টেকে না।

সরকার ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতা হারালে ময়দান বিরোধীদের হাতে চলে যায়। তারা সরকারের কাজের অর্থ নিজেদের মতো করে তৈরি করে, যার মূলে সরকারের ব্যর্থতা, নীতির অকার্যকরতা ও জনগণের বঞ্চনা। ধীরে ধীরে এগুলো সাধারণ বোধে রূপ নেয়। যে পক্ষ বাস্তবতার অর্থ নির্ধারণ করে, সে প্রভাবশালী হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বিরোধীরা তিন কৌশল ব্যবহার করে: সহজ ভাষা, আবেগপূর্ণ বর্ণনা এবং দৈনন্দিন সমস্যাকে বড় রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা। এতে তারা সমালোচকের পাশাপাশি ব্যাখ্যাকারী অথরিটি হয়ে ওঠে। সরকারের জটিল ভাষা ও ধীরগতি যোগাযোগ জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে, ফলে ব্যবস্থাগত সত্য থাকলেও সামাজিক সত্য নির্মাণে তারা পিছিয়ে পড়ে।

এর ফলে রাষ্ট্রে দ্বৈত ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠে। সরকার নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে, বিরোধীরা বাস্তবতার অর্থ নির্ধারণ করে। এটি এক্সিকিউটিভ পাওয়ার ও ন্যারেটিভ পাওয়ারের বিভাজন। ন্যারেটিভ পাওয়ার হারালে শাসন বাস্তবে টিকলেও মানসিক ও আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিরোধী দলের তিন ভূমিকা: সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অসন্তুষ্ট জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা। কিন্তু ন্যারেটিভ নির্মাণে সফল হলে তারা বাস্তবতার অর্থ নির্ধারণকারী কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর রূপান্তর নির্দেশ করে, যেখানে ক্ষমতা শাসনের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল।

  • মুসা আল হাফিজ লেখক, গবেষক এবং ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

মতামত লেখকের নিজস্ব