গত কয়েক দিন ধরে গণমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়ে পড়েছে—অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এপ্রিল-মে মাসে এত বৃষ্টি সাধারণত দেখা যায় না। গরমে কাতর মানুষেরা স্বস্তি পেলেও ধানচাষীদের জন্য এটি বড় বিপদ ডেকে এনেছে।

অতীতে বর্ষার ধান বা ‘আমন’ ছিল আমাদের প্রধান ফসল। কিন্তু ষাটের দশকে ‘সবুজ বিপ্লব’ শুরু হয়। ম্যানিলা থেকে আনা ধানবীজ মাঠ জয় করে। এর সঙ্গে কৃত্রিম সেচের প্রসার ঘটে। শুকনো মৌসুমে চারদিক সবুজে ভরে যায়। এ সময়ের ধানকে বলা হয় বোরো। এখন উচ্চফলনশীল ধানের ব্যাপক চাষ চলে, যাকে লোকে ইরি বলে। ইরি ধানে মাঠ সয়লাব হয়ে যায়। এর চারা রোপণ হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এবং কাটাই হয় এপ্রিল-মে মাসে। অনেক জায়গায় এখনো ধান কাটা চলছে। হঠাৎ বেরসিক বৃষ্টি এসে বিপর্যয় ডেকেছে। অনেকে কাটতে পারছেন না, যাঁরা কেটেছেন তাঁরা শুকাতে পারছেন না।

হাওরের চাষীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল নিচু ভূমি হাওর। উপর থেকে দেখলে এটি বাটির মতো মনে হয়। বর্ষায় এ জলে টইটম্বুর থাকে, শুকিয়ে জমি জেগে ওঠে এবং বোরো ধানে ভরে যায়। বেশি নিচু জায়গাগুলো বিল বা জলমহাল, যেখানে মাছ কিলবিল করে। এগুলো ইজারা নিয়ে কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়।

হাওর এক অনন্য ইকোসিস্টেম। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এ অঞ্চল। এখানে ঘোরাফেরা না করলে এর বৈশিষ্ট্য বোঝা কঠিন। প্রধান ফসল মাছ ও ধান। প্রকৃতি এতে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নদী ভরাট, হাওরতল উঁচু হওয়া এবং অপরিকল্পিত স্থাপনায় ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত। গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের পানির তোড়ে অনেক জমি তলিয়ে গেছে। কৃষকদের মাথায় বাজ পড়েছে।

হাওরের চারপাশে ছোট গ্রামে মানুষ গিজগিজ করে। ফসলের জমি ৫ মাইল বা ১০-১৫ মাইল দূরে। কাটা ফসল ঘরে নেওয়ার ব্যবস্থা নেই। কেউ কিছু তুলতে পেরেছে, খড় মাঠে রয়েছে। অনেকের সর্বস্ব গেছে। উপরন্তু ধান কাটার শ্রমিকের অভাব। এত অল্প সময়ে সব জমি কাটা অসম্ভব। শ্রমিকের মজুরি নাগালের বাইরে চলে গেছে। এটি ‘স্কেয়ার্সিটি ফ্যাক্টর’। চাহিদা-সরবরাহের অসামঞ্জস্য।

পত্রিকা বা টিভিতে সবটা আন্দাজ করা যায় না। তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। বাস্তব ছবি উঠে না, কখনো অতিরঞ্জন হয়। আমরা দুঃখকে ফুলিয়ে দেখতে পছন্দ করি, ফলে যায়-যায় রব ওঠে।

একসময় হাওরে শুধু মাছ ছিল। মানুষ বাড়তে থাকে, আশপাশের গরিবরা বসতি গড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাদে জনঘনত্ব কম। হাওরের ভাষা সিলেটের উঁচু এলাকার থেকে আলাদা।

প্রয়োজনে ধানচাষ শুরু হয়। শুরুতে নদীতীরে প্রাকৃতিক সেচনির্ভর বোরো। পরে যান্ত্রিক সেচ ও উচ্চফলনশীল বীজ আসে। বোরো ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ‘সাবমার্সিবল এমব্যাংকমেন্ট’ বাঁধ তৈরি হয়। এর উচ্চতা কম, বর্ষায় তলিয়ে যায়। নদী-খালে স্লুইসগেট রয়েছে ফসল না তোলা পর্যন্ত পানি ঠেকাতে। ১৫ মে তারিখকে হিসাব করে বাঁধ তৈরি। এরপর বাঁচানো যায় না। প্রতি ৪-৫ বছরে আগেই তলিয়ে যায়।

আশির দশক থেকে প্রকল্পে এ বাঁধ হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এলাকায় ক্ষতি কম। কিন্তু বড় অংশ বাইরে, সেখানে ফসল ডুবে। মানুষ খালি জায়গায় রোপণ করে, সুরক্ষা নেই। নিয়তির ওপর নির্ভর।

হাওরজুড়ে সব জায়গায় বাঁধ নেই। শুরুতে জমি দিয়েছিল, এখন জমি পাওয়া যায় না। সরকার কিনে বানায় না। বিনিয়োগ নেই, নদীরক্ষায় চলে গেছে। হাওর দুয়োরানি।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওর ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ছিল, পরে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন দপ্তর হয়। এর কাজ জানা যায় না।

ইদানীং নদী খনন নিয়ে শোরগোল। পলি-বালুতে নদী ভরাট। নদী দখল হয়েছে। বহমান রাখতে খনন দরকার। অসংখ্য ড্রেজার লাগবে, দেশে তৈরি করতে হবে। করদাতার টাকায় সাদা হাতি পোষার চেয়ে এ জরুরি। কিন্তু ড্রেজার আমদানিতে সিন্ডিকেট, মন্ত্রী-আমলার গ্রুপ গজায়।

নদী খনন এককালীন নয়। সারা বছর চলতে হয়। খাতটি গুরুত্বহীন।

একসময় ‘ডেলটা প্ল্যান’ নিয়ে হইচই ছিল। সরকার বদলে প্রকল্প হিমঘরে। পরিকল্পনা কমিশনের দলিল তৈরির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী একজন জেলে, একজন জামিনে। এখন কথা নেই।

বর্ষা আসছে। খরা-বর্ষার কাল পাল্টাচ্ছে। আমরা বলি জলবায়ু পরিবর্তন। এটি সৃষ্টির সঙ্গে। মানিয়ে নেওয়া দরকার। পানিসম্পদ জনসম্পদের পরে। ভালো ব্যবস্থাপনায় দেশ এগোবে। হাওরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে। সরকার বদলালেও থাকবে।

কোথায় ঐকমত্য? আমরা পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া। একে বলি আমাদের নেতার প্রকল্প, ওকে বলি অন্যের স্বপ্ন। বালখিল্যের শেষ নেই!

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব