বাংলা সাহিত্যের আকাশে যুগ যুগ ধরে আলো ছড়িয়ে চলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ ২৫ বৈশাখ, তাঁর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। বাঙালির হৃদয়ে এ দিন কেবল এক কবির স্মরণ নয়, বরং আনন্দ, আবেগ ও সাংস্কৃতিক উদ্দীপনার মহোৎসব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক রুচির নির্মাতা। তাঁর সৃষ্টি মানুষের মনে ভালোবাসা, মানবতা ও সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগায়। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ রচনা ও চিঠিপত্র—সাহিত্যের কোনো শাখাই তাঁর অনন্য সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়নি। তাঁর রচিত দুই হাজারের বেশি গান আজ ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামে বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর চিত্রকলা উপমহাদেশের চিত্রকলাকে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেননি শুধু, তাকে আধুনিক চিন্তা, মনন ও সৌন্দর্যবোধ প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যমে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর কবিতায় মানবহৃদয়ের সব অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। গানগুলো আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম ও মানবতার সুরে অনুরণিত। জীবনের কোনো অনুভূতি তাঁর সৃষ্টির বাইরে নেই। তিনি বাংলা সাহিত্যকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে বিশ্ব বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তাই বহু যুগ পরেও তাঁর কবিতা, গান ও দর্শন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক, মা সারদাসুন্দরী দেবী ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী। পরিবারের সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সেই অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। ধীরে ধীরে তিনি বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন।

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য মর্যাদা দেন। এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির গৌরবের মুহূর্ত। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বের মানুষ বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হয়।

সাহিত্য ও সংগীত ছাড়াও শিক্ষা, কৃষি উন্নয়ন ও সমাজ গঠনে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে জ্ঞানচর্চা, মানবতা ও বিশ্বজনীনতার আদর্শ প্রাধান্য পায়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখ তাঁকে স্পর্শ করত। গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে তিনি নানা উদ্যোগ নেন।

আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁর সৃষ্টি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিভিন্ন সংকটকালে তাঁর গান ও কবিতা মানুষকে সাহস, শক্তি ও প্রেরণা জোগায়। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, সৌন্দর্য ও রুচিবোধের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশ্বকবির ৮০ বছরের কর্মজীবনের মায়া কাটে ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ।

জন্মদিন উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকাসহ শাহজাদপুর, শিলাইদহ ও পতিসরে আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনা ও কবিতা আবৃত্তির মতো কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও তাঁকে স্মরণ করছে।

কবিগুরুর জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লেখেন, “বাংলা সাহিত্যের মহত্তম কণ্ঠস্বর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর অমর অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার জন্য কামনা করি অনন্ত শান্তি। বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণই ছিল তাঁর অবিনাশী সৃজনশীলতার মূল অন্বেষা। কাব্য, সংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলার পরতে পরতে এই মানুষ, মানবতা, শান্তি, প্রেম ও প্রকৃতির জয়গান গেয়েছেন অনন্যসাধারণ শৈল্পিক কুশলতায়, যা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতের অমূল্য সম্পদ।”

প্রধানমন্ত্রীর পোস্টে আরও লেখা হয়েছে, “বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধ-সংঘাত, বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারায় ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত পরিস্থিতি, উগ্রবাদের উত্থান, জাতিতে জাতিতে হানাহানি—এসবের কারণে রবীন্দ্রনাথ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।”

ঢাকায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমি চার দিনব্যাপী রবীন্দ্রজয়ন্তী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করবেন। আলোচনার পর থাকবে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে।

ছায়ানটের আয়োজনে দুই দিনের রবীন্দ্র উৎসব আজ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে শুরু হবে। আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠশীলনের আয়োজনে অনুষ্ঠান সকাল সাড়ে আটটায় ৭৩/১ এলিফ্যান্ট রোডের রিজেন্ট প্লাজার ওয়াহিদুল হক মিলনায়তনে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার আয়োজনে দুই দিনের ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত উৎসব’ আজ সকাল ১০টায় আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে শুরু হয়েছে। বিকেলের অধিবেশন সাড়ে পাঁচটায়। প্রতিদিন দুই বেলা অধিবেশন হবে। বাংলা একাডেমির আয়োজনে ১১ মে বেলা তিনটায় সেমিনার ও রবীন্দ্র-পুরস্কার-২০২৬ প্রদানের অনুষ্ঠান হবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে।